২৭ মার্চ ২০১৮
নিজস্ব প্রতিবেদক : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মাহিদ আল সালাম হত্যার প্রতিবাদে মুখর শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার সময় তারা নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্টে সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। এসময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কাফনের কাপড় পড়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে।
এর আগে সকাল নয়টা থেকেই ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন বিভাগের অন্তত সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। পরে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভ মিছিলটি পরবর্তীতে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে চৌহাট্টা এসে সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয়। এসময় নিরাপদ সিলেটের দাবি জানান বিক্ষোভকারীরা।
এছাড়াও আন্দোলনকারীরা এসময় মাহিদ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের দাবী জানান।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় শুয়ে থাকেন কয়েকজন শিক্ষার্থী, আর তাদের চারপাশে গোল হয়ে বসে-দাঁড়িয়ে থাকে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। তাদের কণ্ঠে নিরাপদ সিলেটের দাবিতে শ্লোগানে উত্তাল হয় নগরীর চৌহাট্টা চত্বর।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা এসময় “ছিনতাই ছিনতাই আর কতো রক্ত চাই, এতো এতো রক্ত কেনো? অনিরাপদ সিলেট নয় নিরাপদ সিলেট চাই, জাগো প্রশাসন জাগো অপরাধীদের ধরো, মাহিদ ভাই কি একলা মরছে? তাঁর সাথে কি আমরা মরি নাই?? আর কতো শুনবো আকাশবাণী??? এবার আমরা বাঁচতে চাই মাহিদ হত্যার বিচার চাই, নিরাপদে বাঁচতে চাই বাচার মতো বাঁচতে চাই, হত্যা ছিনতাই রাহাজানি সব বন্ধ কর, সব ছাড়িয়া কলম ধর” সহ বিভিন্ন ব্যানার প্ল্যাকার্ড নিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন।
চৌহাট্টা মোড়ে এই অবস্থানের কারণে বন্ধ হয়ে যায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সব ধরণের যান চলাচল। চৌহাট্টা থেকে আম্বরখানা, নয়াসড়ক, রিকাবী বাজার ও জিন্দাবাজার সড়কে দেখা দিয়েছে তীব্র যানজট।
তবে মানবিক আর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতেই দেখা গেল শিক্ষার্থীদের। তাই জরুরি সেবায় নিয়োজিত এম্বুলেন্সকে গন্তব্যে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিচ্ছেন নিজেরাই। আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট সাময়িক অসুবিধার জন্য মাইকেও বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করতে শোনা গেল নগরবাসীর কাছে।
এসময় শবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের সাথে আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করে তাদের সাথে যোগ দেয় বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কার্যনির্বাহী সংসদের অন্যতম সদস্য, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, ৩ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলার মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল খালিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মাহিদ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম সাহেবের সন্তান। তার মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, মাহিদের মা গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আছে। এটা সবচেয়ে দুঃখের বিষয় তিনি এখনো জানেনই যে তার প্রিয় সন্তানটি আর এ দুনিয়াতে বেঁচে নেই।
তিনি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সম্প্রতিকালে নগরীতে ছিনতাই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমরা মেনে নিতে পারছিনা। যেসব ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মাহিদকে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে সেসব খুনিদের চিহ্নিত তাদেরকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করান হোক। তিনি বলেন, আজকে মাদিহ হত্যার বিচারের দাবিতে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে রাস্তায় এসে নেমেছে। আমরা চাইনা মাদিদের মতো আরো মেধাবীরা আকালে হারিয়ে যাক। তাই অনতিবিলম্বে আমরা দেখতে চাই মাহিদের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের ব্যবস্থা করা হোক।
এসময় তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গতি প্রকাশ করে বলেন, আপনারা যেভাবে আপনাদের অবস্থান ধর্মঘট করছেন, এভাবেই শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে যাবেন বলে অনুরোধ জানান তিনি।
এছাড়াও অবস্থান কর্মসুচীতে বক্তব্য রাখেন শাবি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমদ, অর্থনীতি বিভাগের এলামনাই এসোশিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাশ্মিরী রেজাসহ আরো অনেকেই।
এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাহমুদ জানান, আমরা এখানে শুধু মাহি হত্যার বিচারের দাবিতেই আজ মাঠে নামিনি। আমরা চাই মাহিদের মতো আর যেনো কেউ এভাবে অকালে চলে যেতে না হয়। আমারা নিরাপদ সিলেট দেখাতে চাই। তাই আমারা আজ সবাই রাস্তায় নেমে এসেছি।
তিনি জানান, এই আন্দোলনটি তারা ছড়িয়ে দিতে চান সারাদেশে। তারা চান না এভাবে আর কোন শিক্ষার্থীর বা অন্য কারো জীবন অকালে ঝরে যাক। মাহিদের হত্যাকারীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলেও জানান তিনি।
বেলা সাড়ে বারোটায় শুরু হওয়া অবস্থান কর্মসূচি শেষ বেলা দেড়টায়। পরে আন্দোলনকারীরা মিছিল সহকারে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারসহ সিলেটের সড়কগুলো নিরাপদ করার দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি নিয়ে যায় সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে।
রোববার দিবাগত রাত ১টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত মাহিদ আল সালামকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। তারা নিয়ে যায় মাহিদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ ও ল্যাপটপ। তাৎক্ষনিকভাবে আহত মাহিদকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তিনি মারা যান।
মাহিদ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি সিলেট থেকে ঢাকায় যাওয়ার জন্য কদমতলী বাস টার্মিনালের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।
(আজকের সিলেট/২৭ মার্চ/ডি/এসটি/ঘ.)