২৬ মার্চ ২০১৮
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : দিরাইয়ে চলতি বোরো মৌসুমের জন্য হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের নামে চলছে রাজনৈতিক হরিলুট। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ছড়াছড়ি কুলঞ্জ ইউনিয়নের টাঙ্গুয়া ও মৌয়া হাওরে। দ্বিতীয় পর্যায়ে সময়সীমা বৃদ্ধি করেও অধিকাংশ প্রকল্পেই ৫০ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি। নির্মাণ কাজের কোন নীতিমালাই মানছেন না রাজনৈতিক পরিচয়ধারী প্রকল্প কমিটির সদস্যরা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পাউবো উপজেলা কমিটির সভাপতি কর্তৃক প্রকল্প কমিটিকে কারণ দর্শানো নোটিশ ও প্রকল্প কমিটির সভাপতিকে আটক করেও রাজনৈতিক চাপের কারণে কাজ ঠিকমত আদায় করা সম্ভব হচ্ছেনা।
সরেজমিন কুলঞ্জ ইউনিয়নের টাঙ্গুয়া, বোয়ালিয়া ও মৌয়ার হাওর উপ-প্রকল্প এলাকা ঘোরে দেখা যায়, ৭-৮টি প্রকল্প রয়েছে অপ্রয়োজনীয়, শতভাগ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প রয়েছে ৩টি। টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকল্প নং৬৫ সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানকে ২৪লাখ চার হাজার টাকা, ৬৫(ক) সভাপতি দবির আহমেদকে ১৮লাখ ৩৬হাজার ৭২৮টাকা, ৬৫(খ) সভাপতি আতাউর রহমানকে ১৭লাখ ৬২হাজার ৭৯৪টাকা বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে। এ তিনটি প্রকল্পের কোন প্রয়োজন নেই, কুশিয়ারা নদীর পাড় দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের স্থায়ী পাকা রাস্তা রয়েছে।
রাস্তার পাশ দিয়ে নদীর পাড়ে হাওর রক্ষা বাঁধ হচ্ছে দেখে এলাকাবাসীই রীতিমত অবাক হয়েছেন। বিবিয়ানা ডিগ্রী কলেজের প্রিন্সিপাল নৃপেন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন, আকিলশাহ বাজার থেকে মার্কুলি শরালিতুপা হয়ে শাল্লা এলাকা পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীর পাড় দিয়ে সরকারের পাঁকারাস্তা রয়েছে। পাঁকা রাস্তা থাকার পরও সেখানে হাওর রক্ষা বাঁধ হচ্ছে দেখে আমরা অবাক হয়েছি। এ রাস্তার উপর দিয়ে যখন পানি গড়াবে তখন আর ফসল রক্ষা নয় বাড়ী ঘর রক্ষাই কঠিন হবে। স্থানীয় জনগণ জানান বাঁেধর নামে সরকারের অর্ধকোটি
লোপাট করা হয়েছে, এখানে বাঁধের কোন প্রয়োজন নেই। বরং নদীর পাড় থেকে এস্কেভেটর মেশিণ দিয়ে মাটি তুলার ফলে নদী ভাঙ্গন দেখা দিতে পারে। যারা নিজের স্বার্থে এলাকাবাসীকে এমন বিপদে ফেলছেন তারা জনগণের শত্র“। একই হাওরের জারলিয়া নদীর দক্ষিণপাড়ে নাচনী কবরস্থান হইতে আনন্দ নগরের পশ্চিম ভাঙ্গা নামক স্থান পর্যন্ত দুটি প্রকল্প নং-১৯(ক), সভাপতি ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা আবদুর রকিবকে ২২লাখ ১৮হাজার ৮২৯ টাকা, প্রকল্প নং-১৯ সভাপতি যুবলীগ নেতা সোহেল রানাকে ২০লাখ ১৫হাজার ৬১৬টাকা বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে। অথচ এ দুটি প্রকল্প এলকায় ভরা বর্ষা মৌসুমেও পানি উঠেনা বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এ রাস্তা দিয়ে সারা বৎসর লোক চলাচল করে।
রাস্তার উপরে সামান্ন মাটি ফেলে টাকা হাতিয়ের নেয়ার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। জারলিয়া নদীর উত্তর পাড়ে, ঘোড়া মারা বাঁধ হতে তারাপাশা মিলনগঞ্জ বাজার পর্যন্ত চারটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এখানেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁিক, প্রকল্প নং-৬৪’র সভাপতি ইউপি সদস্য যুবলীগ নেতা জাকারিয়া হোসেন এর প্রকল্প তালিকার সাথে মিল থাকলেও অপর তিনটি প্রকল্প ৬৪(ক), ৬৪(খ), ৬৪(গ) পাউবো থেকে প্রদত্ত তালিকার সাথে প্রকল্প এলাকার সাইনবোর্ডের কোন মিল নেই। এ তিনটি প্রকল্পের সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ ইয়াউর রহমান, সৈয়দ তহুর আলী, সৈয়দ রাসেল আহমদ। অমিলকৃত প্রকল্প তিনটির আদোকোন প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেননা এলকার কৃষকরা। এ তিনটি প্রকল্পে বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে ৫২লাখ ৩৩হাজার ৮৪০টাকা।
টাঙ্গুয়ার হাওরের তাড়ল ইউনিয়ন এলকার জালালপুর হতে রামপুর পর্যন্ত নদীর পাড়ে গ্রাম থাকার পরও দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, প্রকল্প নং-২৯(খ) সভাপতি মতশি^র চৌধুরীকে ২৩লাখা ৫৮হাজার ৪৫৪ টাকা, প্রকল্পনং- ২৯(ক) সভাপতি আফজল
হোসেনকে ১১লাখ ৬৯৯ টাকা বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে। জালালপুর ও রামপুরের মধ্যস্থানে সামান্ন কিছু জায়গা ছাড়া মাটি ভরাটের কোন প্রয়োজন নেই। একই ইউনিয়নের টাঙ্গুয়ার হাওরের উপ প্রকল্প মৌয়া হাওরের দেখা গেছে প্রকল্পের মাহামরি, দেড় থেকে দুই হাজারমন ধান উৎপাদণের ছোট এ জাওর এলাকায় ৬টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকল্প নং-৬৯, সভাপতি যুবলীগ নেতা ফুলকাছ মিয়াকে ৩২লাখ ৮৩হাজার ৬৪২ টাকা, ৬৯(ক) যুবলীগ নেতা ছালেহ আহমদ খানকে ২৭লাখ ৭৯হাজার ৭৬৯টাকা, ৬৯(খ) সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল ওয়াদুদ খানকে ১৩লাখ ৭২হাজার ২৯১টাকা বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৬৯(ক) ও ৬৯(খ) অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প। ৬৯ প্রকল্পটি মিলনগঞ্জ বাজার ব্রিজ হতে কুমারখালি নদীর পাড় দিয়ে ওয়াপদার বেড়ীবাঁধ পর্যন্ত করার কথা থাকলেও ব্রিজের ঝুকিপূর্ণ এলকা বাদ দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কুমারখালি নদীর পাড়ে বাঁধের গোড়া থেকে এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। দ্বীতিয় পর্যায়ে বর্ধিতকরণ ১০টি প্রকল্পের মধ্যে ৩টি রয়েছে এ হাওরেই। প্রকল্প নং-৯৩, সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা গওছ মিয়া চৌধুরীকে ২৫লাখ ৮৮হাজার ৮৪৩টাকা, প্রকল্প নং- ৯৩(ক) সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন চৌধুরীকে ২৩লাখ ৫৮হাজার ৬১টাকা ও ৯৩(খ) সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম চৌধুরীকে ২৬লাখ ১১হাজার ৫৯৮টাকা বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে।
এ নেতারা তিনটি বাঁধের একটিতেও ২০ভাগের বেশী কাজ হয়নি। যেটুকু হয়েছে তাও আবার বাঁধের গোড়া থেকে এস্কেভেটর মেশিন দিয়ে বালি মাটি তুলে বাঁধ করছেন। কোন নীতিমালাই মানছেননা তারা। প্রকল্প নং-৬৬(ক) সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা ছাদ মিয়া চৌধুরী ও প্রকল্পনং নং ৬৬’র সভাপতি ইউপি সদস্য চান মিয়া চৌধুরী আপন দুই ভাই। তাদের প্রকল্পে কাজ হয়েছে ২৫-৩০ভাগ।
ধবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পাউবোর উপজেলা কমিটির সভাপতি মঈন উদ্দিন ইকবাল সরেজমিন প্রকল্প এলকা পরিদর্শণকালে নিয়মমত কাজ না করার দায়ে চান মিয়াকে সভাপতির পদ থেকে প্রত্যাহার ও গ্রেফতারের আদেশ দিয়ে আসলেও পরদিন স্থানীয় সাংসদ ড. জয়া সেনগুপ্তার মধ্যস্থতায় ৭দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্তে আবার তাকেই সভাপতি হিসেবে বহাল রাখা হয়। এনজিও সংস্থা গ্রামীণ জনকল্যাণ সংসদের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমির সভাপতি জামিল চৌধুরী হাওর ঘুরে এসে জানান, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, একই পরিবারের একাধিক সদস্য প্রকল্প কমিটির সভাপতি ও সরকারদলীয় কতিপয় নেতার অনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষে প্রকল্প কমিটি গঠন করায় বাঁধের কাজ সময় মত সম্পন্ন করা যাচ্ছেনা।
এক তাড়ল গ্রামেই দুই পরিবারের ১৩জন লোক প্রকল্প কমিটির সভাপতি। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল আহমদ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজুর রহমান তালুকদার প্রকল্প কমিঠি গঠন থেকে শুরু করে অনেক কিছুতেই তারা রয়েছেন। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে এসব বিষয়ে কথা বললে তিনি নিজের অসহায়ত্বের কথা অবলীলায় স্বীকার করেছেন। হাওর রক্ষা বাঁধের এসব অনিয়ম দূর্নীতি নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
(আজকের সিলেট/২৬ মার্চ/ডি/এসসি/ঘ.)