২৫ মার্চ ২০১৮


হারিয়ে যাচ্ছে চুনারুঘাটের বনাঞ্চল!

শেয়ার করুন

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি : গাছ চুরি আর বনের গাছ কেটে অবৈধভাবে কৃষিজমি বৃদ্ধির কারণে ক্রমেই কমে আসছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বনের পরিমাণ। জেলার ১৮ হাজার বনের মধ্যে চুনারুঘাটেই রযেছে ৮০ ভাগ বন। উপজেলার ৯টি বনবিটের মধ্যে রেমা, কালেঙ্গা, ছনবাড়ি, সাতছড়ি, তেলমাছড়া ও বঘুনন্দন হচ্ছে শুকনো ও মিশ্র চিরহরিৎ বন। এ বনগুলো জীব ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকা। কিন্তু মানুষের অত্যাচারে ক্রমেই এসব বনের গাছপালা কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বনের খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতি বছর ২১ মার্চ সারা দেশের ন্যয় চুনারুঘাটেও বন দিবস পালন করা হয়। কিন্তু বন রক্ষায় সাধারণ মানুষের ভূমিকা নেই বললেই চলে। উপজেলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ প্রাকৃতিক বন রেমা ও কালেঙ্গা বন। জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত এ বনের সৌন্দর্যই আলাদা। শুকনো ও মিশ্র চিরহরিৎ এ বনটিকে সরকার ২০০৫ সালে অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে। বনে ছনবাড়ি, রেমা ও কালেঙ্গায় গেলেই রিসাস বানর, কুলু বানর, লাজুক বানর, চশমাপরা হনুমান, লালচে হনুমানের দেখা মেলে। আছে আন্তর্জাতিকভাবে বিপন্ন পাখি লালমাথা ট্রগন, রাজ ধনেশ, ইমপেরিয়াল পিজিয়ন। বিপন্ন স্তন্যপায়ীদের মধ্যে কাঁকড়াখেকো বেজি, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি, রামকোটা কাঠবিড়ালিও দেখা গেছে এ বনে।

রেমা কালেঙ্গা বনে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, সাত প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা, লতাগুল্ম রেমা-কালেঙ্গাকে সাজিয়ে তুলেছে। দেশের সবচেয়ে বড় বন সুন্দরবনের উদ্ভিদবৈচিত্র্য মাত্র ৩৩০ প্রজাতিতে সীমাবদ্ধ। এছাড়া এ বনে রয়েছে শত বছরের প্রাকৃতিক মহীরহ গর্জন, চাপালিশ, আওয়াল, হারগাজা, বেলু, বট, বনমালী ও শালসহ নানা প্রজাতির গাছ। সঙ্গে রয়েছে বনকর্মীদের আবাদকরা সেগুন, আগর, বহেরা, কাঁঠাল ও আমলকী।

সরেজমিন গিয়ে জানা যায় চোরদের হাত থেকে কোনো গাছই রেহাই পাচ্ছে না। বনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতি রাতেই বনের কোনো না কোনো অংশে কাটা হচ্ছে গাছ। এতে একসময়ের আঁটোসাঁটো এই প্রাকৃতিক বন এখন লতা-ঝোপের জঙ্গল হতে চলেছে। রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় নেমেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা বনের খাড়া গাছ ফুট আকারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বলেন, বনবিভাগের সামান্য জনবল নিয়ে এই বিশাল বন রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। তাছাড়া বনের কোনো সীমানা প্রাচীর নেই। তবে আমাদের কোনো বনকর্মী যদি গাছ পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকে তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। অভয়ারণ্যটি ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৯৬ সালে একে সম্প্রসারিত করায় বর্তমান আয়তন এক হাজার ৭৯৫ হেক্টর। এই অভয়ারণ্যের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কালেঙ্গা রেঞ্জের ৪টি বনবিটের মধ্যে রশিদপুর বিটের অধিকাংশ প্রাকৃতিক গাছ ২০০১-০২ সালের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট গাছকাটা দস্যুদের হাতে উজাড় হয়ে যায়। অবশ্য ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে এ বিটে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে গাছ লাগানো হয়েছে। বর্তমানে এ গাছও কাটা হচ্ছে নির্বিচারে।

উপজেলার সাতছড়ি, তেলমা, রঘুনন্দান, শাহপুর, রেমা, কালেঙ্গা ও ছনবাড়ি বনবিটে এখন চলছে গাছ পাচারের মহোৎসব। রেমা কালেঙ্গায় কথিত ভিলেজারসহ ভূমি দস্যুরা দখল করে নিয়েছে বনের বিশাল এলাকা। তারা পাহাড় কেটে আবাদ করছে প্রতিনিয়ত। পাহাড় পরিণত হচ্ছে কৃষিজমিতে। পাহাড়ের উত্তর দিকে ক্রমেই গড়ে উঠছে লেবু বাগান। দখলের ফলে বনাঞ্চল হযে যাচ্ছে ব্যক্তিগত বাগান। আবার পাহাড় কেটে বাড়ানো হচ্ছে কৃষি জমি।

এতে জীব বৈচিত্র্য হারাচ্ছে রেমা-কালেঙ্গার বন। ভেঙে পড়েছে বনের খাদ্য শৃঙ্খল। বনের প্রাণীরা প্রায়ই বেরিয়ে চলে যাচ্ছে লোকালয়ে। চলতি মাসে চা বাগানে একটি মায়া হরিণ লোকালয়ে ধরা পড়ার পর চা শ্রমিকরা জবাই করে। বন বিভাগের পাহারায় সহায়তাকারী গ্রামবাসীকে অভয়ারণ্য লাগোয়া সমতলে ফসল বোনার জন্য পরিবার প্রতি এক কেয়ার (৩৬ শতাংশ) করে জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু গ্রামবাসী বন বিভাগের অসাধু কর্মচারীদের সহায়তায় বন কেটে এই জমি বাড়িয়েছে। ৩০ থেকে ৫০ কেয়ার জমির মালিকও এখন আছেন সেখানে।

(আজকের সিলেট/২৫ মার্চ/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন