৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮


‘হাতের ইশারায় চলছে’ অর্থমন্ত্রীর ‘আলোকিত সিলেট’

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : ‘দু’জন নারী বন্ধু বসে গল্প করছেন। প্রথমজন বললেন ‘আমারা স্বামী খুব বেশি শক্তিশালী। তিনি বার বার কারাতেতে চ্যাম্পিয়ন হন। অপরজন বলেন, তোমার স্বামী একজন একজন করে হারিয়ে অবশেষে ক্যারাতেতে চ্যাম্পিয়ন হন। আর আমার স্বামীর হাতের ইশারায় সব যানবাহন এমনকি মানুষকেও থেমে যেতে হয়। এখন বল কার স্বামীর শক্তি বেশি। প্রথম নারী এমন কথা শোনে হতবাক; জানতে চাইলেন ওই নারীর স্বামী কী এমন করেন যে, হাতের ইশারায় যানবাহন এমনকি মানুষকেও থেমে যেতে হয়। তখন ওই নারী বললেন, তার স্বামী ট্রাফিক পুলিশ।’-এই গল্পের বাস্তব চিত্র ২২ বছর থেকে সিলেট মহানগরে দেখা যায়। এখনো ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারাই যানবাহন এবং যানবাহনে থাকা যাত্রীকে থেমে যেতে হয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, সিলেটে নেই ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি।’

ট্রাফিক সিগন্যাল বাতিকে ঘিরে আজও আলোর মুখ দেখেনি সিলেট-১ আসনের এমপি ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুইবারের এ এমপির প্রচারণায়ও ছিল আলোকিত সিলেট গড়ার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু মহাজোট সরকার টানা দুই মেয়াদে সিলেট নগরের ব্যাপক উন্নয়ন করলেও এখনও আলোর মুখ দেখেনি সম্ভাবনাময় এ ট্রাফিক ব্যবস্থা। বিশেষ করে ২২ বছরেও নগরের কোনো মোড়ে লাগেনি ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি।

সূত্র মতে, ১৯৯৬-১৯৯৭ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেট নগরের যানজট নিরসনের লক্ষ্যে তৎকালীন পৌরসভার উদ্যোগে ‘মাঝারি শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে লাগানো হয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি। পরর্বতীকালে আধুনিক সিগন্যাল বাতি লাগানো হলেও এখন আর বাতিগুলোর স্মৃতিটুকুও অবশিষ্ট নেই।

সূত্র জানায়, ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ৯০’-এর দশকে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করে তৎকালীন পৌরসভা। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো এখন অকার্যকর। যার কারণে ‘দ্বিতীয় লন্ডন’ খ্যাত সিলেট এখন ট্রাফিক সিগন্যালের বাতিহীন নগরই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে সময়ের পরিক্রমায় দেশের সকল নগর-মহানগরগুলো উন্নত হলেও পিছিয়ে রয়েছে সিলেট মহানগর। ট্রাফিক সিগন্যাল বিহীন নগরই এর অন্যতম উদাহরণ।

এর ফলে বর্তমান ডিজিটাইলাজেশনের যুগে এসেও সিলেটের রাজপথে দেখা মিলছে না কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল বাতির। এখনও সনাতন পদ্ধতিতে নগরীর মোড়ে মোড়ে চলছে হাত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কাজ। এর ফলে প্রতিনিয়তই যানজটের কবলে পড়া নগরবাসী ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি জ্বলার অপেক্ষায় প্রহর কাটাচ্ছেন। আর কত বছর গেলে সিলেটবাসী দেখবেন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে লাল-সবুজ সিগন্যাল বাতি-এমন প্রশ্নও রয়েছে। তবে সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও মহানগর পুলিশ একে-অপরের ঘাড়ে এ পরিস্থিতির দায়ভার চাপাচ্ছেন।

ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ট্রাফিক শৃঙ্খলার স্বার্থে সিগন্যাল বাতি লাগানো অবশ্যই প্রয়োজন। এটা সিটি কর্পোরেশনের কাজ। আমরা তাদেরকে বলেছি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে। বাজেট তো আর পুলিশের নিকট বরাদ্দ দেওয়া হয় না। বাজেট যেহেতু সিটি কর্পোরেশনের, তাই সিটি কর্পোরেশন এগিয়ে আসলে দ্রুত এর সমাধান হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা স্থানগুলো চিহ্নিত করে দিতে পারি।’

সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের। এজন্য পুলিশ কোনো চাহিদাপত্র দেয়নি। নগরীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে তারা যদি সুন্দর কোনো প্রস্তাব নিয়ে আসে, নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয়। তাহলে চাহিদা মতো সিগন্যাল বাতি লাগিয়ে দেওয়া হবে।

নগরের বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘ ২২ বছর আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেট পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ ৬টি মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় তা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। লাগানোর এক বছরের মাথায় নষ্ট হয়ে যাওয়া বাতিগুলো পরবর্তীতে আর কোনো সরকারের আমলেই সংস্কার করা হয়নি। বছর খানেক পর নষ্ট হয়ে যাওয়া বাতিগুলো পরবর্তীতে আর মেরামত না করায় প্রায় সবক’টি পয়েন্টের বাতি ও স্টিলের স্থাপনা নষ্ট হয়ে যায়। সর্বশেষ গেল বছরের প্রথম দিকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায় সিগন্যাল বাতিগুলো। রাস্তা প্রশস্থকরণ ও আধুনিক বাতি লাগানোর জন্যই বাতিগুলো তুলে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সিলেট সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের।

২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বাজেটে ট্রাফিক সিগন্যালসহ রাস্তাঘাটের বাতি সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থ বছরের (২০১৭-১৮) বাজেটে নতুন করে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনে কোনো বরাদ্দ রাখেননি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। আর অনেকটা এ কারণেই সিলেট মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ছে।

এদিকে, প্রতিদিনই সাধারণ মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে যানজটের কবলে পড়ে। জনবল সংকট হওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। সিলেট নগরীর প্রবেশপথ সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, রিকাবীবাজার, চৌহাট্টা, নয়াসড়ক, নাইওরপুল, আম্বরখানা পয়েন্টে বসানো হয়েছিল ট্রাফিক সিগন্যাল বাতিগুলো।

সরেজমিনে পয়েন্টগুলো ঘুরে দেখা যায়, নাইওরপুল ছাড়া অন্য জায়গাগুলোতে স্থাপিত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতির স্টিলের খুঁটিগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। নতুন করে সিগন্যাল বাতি স্থাপন না করায় বুঝার কোনো উপায় নেই যে, এসব স্থানে একসময় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের খুঁটি দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি না থাকায় হাতের ইশরায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশকে। এ ক্ষেত্রে হাতের সিগন্যাল অনেক সময় মানেন না চালকরা।

পুলিশ সার্জেন আবু বক্কর শাওন বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি নগরে লাগানো জরুরি। দেশের বিভিন্ন নগরীতে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি থাকলেও সিলেট নগরীতে নেই। যার কারণে প্রায়ই ট্রাফিক পুলিশকে যানজট নিরসনে প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়। তবে সিলেট মহানগরীতে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি লাগানোর জন্য মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া ‘স্যার’ অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।’

এ ব্যাপারে মহানগর পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘শহরের রাস্তা প্রসস্থ করণের কাজ চলছে। কাজগুলোর শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আমরা ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপনের জন্য সিসিকের সাথে কথা বলব। তিনি বলেন, শহরে সিগন্যাল বাতি জরুরি। সিগন্যাল বাতি না থাকায় সবচেয়ে বেশি কষ্টের শিকার হতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশকে। তারা হাত দিয়ে যানবাহন থামাতে হয়। হাত না মামানো পর্যন্ত গাড়ি থেমে থাকতে হয়। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা রোদ-বৃষ্টিতেও এ দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই সিগন্যাল বাতি অবশ্যই লাগানো প্রয়োজন।’

শেয়ার করুন