৩ আগস্ট ২০২৩


গোয়াইনঘাটে জারা লেবু চাষে কৃষক মোজাহিদুলের বাজিমাত

শেয়ার করুন

সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশা, গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি : সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে জারা লেবুসহ মিশ্র ফল বাগান করে একজন সফল চাষী মোজাহিদুল ইসলাম। অদম্য ইচ্ছা শক্তি নিয়ে বাগানে বিভিন্ন ফলের চাষ করে সফলতার পাশাপাশি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন মোজাহিদুল ইসলাম নামের এই যুবক। তার সফলতায় এখন অনেক বেকার যুবক মিশ্র ফল বাগান করার দিকে ঝুঁকছেন। এমন কি তার এই মিশ্র ফল বাগানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন চ্যানেলের সাংবাদিক কৃষি বিভাগের অনেক ঊর্ধতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় মানুষের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলায় বর্তমানে ৬০ একর ভূমিতে জারা লেবুর চাষ হয়ে থাকে।পাহাড়-টিলা অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ও জাফলং ইউপিতে জন্মে অনেক ধরনের লেবু। উঁচু নিচু টিলায় হরেক রকমের লেবুর ভিড়ে সহজেই নজর কাড়ে ‘জারা’ লেবু। আকার, ঘ্রাণ ও স্বাদের কারণে সিলেটিদের কাছে বিশেষ কদর এই লেবুর। একেকটি জারা লেবুর ওজন আধা কেজি থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। জারা লেবু সাইট্রাস গোত্রের মধ্যে বিশেষ ধরনের ফল।পাহাড়ি ও বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে এর ফলন ভালো হয়ে থাকে।জারা লেবুর উৎপত্তি সিলেটের পার্শ্ববর্তী ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ে।জারা লেবু অত্যন্ত জনপ্রিয় ও রপ্তানিযোগ্য একটি ফসল। দিনকে দিন জারা লেবু চাষে চাষীদের আগ্রহ বাড়ছে।বর্তমানে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলাগুলোতে এই লেবুর চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জারা লেবুর বাজার মূল্য অনেক বেশি।

কৃষক মোজাহিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে জারা লেবু দিয়ে তার বাগান শুরু করেন। পরে একে একে জারা লেবু ছাড়াও তিনি পানি জারা, গোল জারা, বিছনা জারা, আদা লেবু, বাতাবি লেবু, এলাচি লেবু, কমলা লেবু, মাল্টা, মুখরোচক সাতকরাসহ হরেক জাতের লেবু চাষ করেন পাশাপাশি চাষ করেন আম, জাম, কাঠাল, কলা, পেপে, বিভিন্ন জাতের পেয়ারা, লটকন গোল মরিচ, আদা, তেজপাতা, নাগা মরিচ, ধানু মরিচ, আমলকি, আনারস, আমড়া, নাশপাতি, নারিকেল, সুপারিসহ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল। এইসব ফলফলাদি বিক্রি করেই তিনি  প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মত লাভ করে থাকেন।তিনি ২২ বিঘা জমিতে শুধু জারা লেবুর চাষ করেছেন। যেখানে প্রতিদিন চারজন শ্রমিক কাজ করে চারটি পরিবারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আবার কাজের প্রয়োজনে শ্রমিক বাড়াতে হয় পাশাপাশি তিনি নিজেও কাজ করেন।

তার উৎপাদিত জারা লেবু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হয়  বিদেশেও। তার দেখাদেখি অনেকেই এখন এই লেবু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সফল এই কৃষক মোজাহিদুল ইসলামকে জারা লেবুর রাজ্যের রাজা,জারা লেবুর সম্রাট এমনকি জারা লেবুর ব্রান্ডও বলে থাকেন অনেকে।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সফল এ কৃষক জানান, প্রায় ছোটবেলা থেকে দাদা ও বাবার হাত ধরে কৃষিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৯৮ সালে জারা লেবু চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষক মোজাহিদুল ইসলাম পরিচিতি লাভ করেন। সেই যে শুরু তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তার বাগানের উৎপাদিত এ জারা লেবুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সিলেটে। শুধু সিলেটে নয়। সিলেটি ভাষাভাষি জাতি সত্তার মানুষজন যেখানেই আছে সেখানেই রয়েছে জারা লেবুর কদর। এর চাহিদা আছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায়। ফতেহপুরসহ সিলেট থেকে উৎপাদিত জারা লেবু রপ্তানি করে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক টাকা আয় হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, শুরু থেকেই গোয়াইনঘাট উপজেলা কৃষি অফিস তাকে সার্বিক সহযোগিতা করে আসছে।
কৃষক মোজাহিদ জানান, প্রতিবছর তার বাগান হতে উৎপাদিত জারা লেবুসহ ফসল বিক্রি করে তিনি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করে থাকেন। তিনি জানান, এক সময় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অনেক বাংলাদেশির বসবাস। তাদের কাছে চাহিদা থাকায় জারা লেবু রপ্তানিও হয়। তবে এ লেবুগাছের ক্যাংকার রোগের কারণে বাংলাদেশ থেকে ২০০৭ সালে সাইট্রাস গোত্রের ফল আমদানি নিষিদ্ধ করে যুক্তরাজ্য। সেই থেকে তার লাভের পরিমাণটা কমে এসেছে।নতুবা তিনি বছরে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা আয় করতেন।সে সময় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে তার বাবাকে জারা লেবুর সম্রাট বলে আখ্যায়িত করা হতো।

তিনি আরও বলেন, জারা লেবু একটি ব্যাপক লাভজনক অর্থকরি ফসল। সিলেটের বাজারসহ দেশের বাহিরে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এ থেকে বড় অঙ্কের টাকা আয় করা সম্ভব। তাই আমি মনে করি সঠিক জাত যাচাই করে আর যত্ন নিয়ে এ ফসল উৎপাদনে স্থানীয় কৃষকরা আরো দায়িত্বশীল হলে তারাও আমার মতো লাভবান হবেন। তিনি আরো বলেন,জারা লেবুর চাষে লসের কিছু না,এলাকার কেউ করতে চাইলে তিনি সকল ধরনের সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকবেন।

গোয়াইনঘাট উপজেলা কৃষি অফিসার রায়হান পারভেজ রণি বলেন,মোজাহিদ একজন সফল কৃষক এবং সিলেটের সবচেয়ে সফল জারা লেবু চাষি। তার বাগানে জারা লেবুসহ সব ধরনের ফসল চাষ করে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।জারা লেবুর উদ্যোক্তা সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি ও জারা লেবুর চাষ সম্প্রসারণে গোয়াইনঘাট উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর কাজ করছে বলে জানান তিনি। গোয়াইনঘাট উপজেলায় বর্তমানে ৬০ একর ভূমিতে জারা লেবুর চাষ হয়ে থাকে।

শেয়ার করুন