২ আগস্ট ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির মাঠ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। আর রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির দাবি নির্দলীয় সরকার। এই ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়ে রাজপথ দখলে রাখার চেষ্টা করছে দেশের প্রধান এই দুই রাজনৈতিক দল।
চলমান এই সংকট থেকে উত্তরণে বার বার সংলাপের তাগিদ দিয়ে আসছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সংলাপই চলমান সংকট উত্তণের একমাত্র পথ। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। সমাধানে আসতে হলে উভয় পক্ষকে ছাড় দিতে হবে। তা না হলে চলমান সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
এবার একই মত প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশনও (ইসি)। কমিশন মনে করে, চলমান সংকটগুলো রাজনৈতিক। এগুলো রাজপথে মীমাংসা করার বিষয় নয়। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর এক টেবিলে বসা উচিত।
চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন। সে লক্ষ্যে প্রস্তুতিও নিচ্ছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বিএনপি ও তাদের মিত্ররা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে নারাজ।
তাদের দাবি, বর্তমান সরকার পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। আর আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধানের বাইরে একচুলও নড়বে না। দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। এ নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে টানাপোড়েন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই দুই দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত হচ্ছে রাজপথ। এ অবস্থায় চলমান সংকট থেকে উত্তণে দুই দলকে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জানতে চাইলে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই অবস্থায় আলোচনা ছাড়া কোনো সমাধান হবে না। সংলাপ করতেই হবে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বর্তমানে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় আলোচনা ছাড়া সমাধান হবে না। না হয় দেশের গতি প্রকৃতি কোন দিকে যায় তা বলা যাচ্ছে না।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক বলেন, ‘দুই দলের অনড় অবস্থানে সংলাপের আশা অতি ক্ষীণ বলে প্রতীয়মান হলেও সংলাপ ছাড়া পরস্পর বিরোধী অবস্থান সবার জন্য অশনিসংকেত। এতে দেশ অশান্ত হবে। সংঘাত-হানাহানি ঘটবে। ক্ষতি হবে দেশের।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সংলাপেই সমাধান। এর বিকল্প নেই। তাই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসতে হবে। সব মহল থেকেই সংলাপে বসার তাগিদ আসছে। এক্ষেত্রে সরকারকেই এ উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সংকট সমাধানে অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বসতে হবে। তাহলেই একটা পথ বের হতে পারে।’
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে ফের এক টেবিলে বসে আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন মনে করছে, আলোচনা ছাড়া চলমান সংকটগুলো উত্তরণ সম্ভব নয়।
গতকাল মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাসের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান, ইসি সচিব জাহাংগীর আলম উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বলেছি, উনারাও বিশ্বাস করেন, (সমস্যা সমাধানে) রাজনৈতিকগুলোর মধ্যে ডায়ালগ প্রয়োজন। ডায়ালগ ছাড়া এ সঙ্কটগুলো আসলে রাজপথে মীমাংসা করার বিষয় নয়। কমিশন মনে করে, রাজনৈতিক দলগুলোর এক টেবিলে বসা উচিত; একসঙ্গে চা পান করা উচিত। তারপরে আলোচনা করে সঙ্কট নিরসনের চেষ্টা করা উচিত।’
রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে ফের দলগুলোকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। যে সঙ্কটটা বিরাজ করছে তা রাজনৈতিক। এর সঙ্গে আমাদের কাজের কোনো সংঘাত নেই। কিন্তু এ সমস্যাগুলো যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান হয়ে যায়, তাহলে আমাদের জন্য নির্বাচন আয়োজন অনেক কমফোর্টেবল হবে।’
হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘কমিশন প্রত্যাশা করে, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কতগুলো বিষয় নিয়ে সংকট প্রকটভাবে রয়েছে, সেগুলো যে কোনো মূল্যে সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। একটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক। যে স্থিতিশীল পরিবেশে আগামী নির্বাচনটা হবে।’
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর দাবির পাশাপাশি গত কয়েক মাস ধরেই বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সর্বশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরে নির্বাচন প্রসঙ্গটি সব কিছুর ওপরে স্থান পায়। নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টিতে বিদেশি প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এসব প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী, নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পৃথকভাবে বৈঠক করে তাদের চাওয়া ও মনোভাব জানিয়ে দিয়েছে। তাদের দেয়া বার্তা অনেকটাই পরিষ্কার হলেও সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে সেটি পরিষ্কার নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভিসানীতি ঘোষণার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা আলোচনা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তারপরই তাদের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধি দল এখনো বাংলাদেশে রয়েছে। তারা পৃথকভাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সব বৈঠকেই অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ছাড়ার আগে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছে। তবে গেল নির্বাচনের চেয়ে এবার বিদেশিদের তৎপরতা বেশি হলেও তা নিয়ে বিচলিত নয় সরকার। এই অবস্থানের কথা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘টানাপোড়েন’ থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে তার কোনো প্রভাব পড়বে না।
পশ্চিমা দেশগুলোর কারো কারো ভ্রান্ত ধারণা আছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানিয়েছেন, সেগুলো দূর করতে দূতাবাসগুলো চেষ্টা করছে। আন্দোলনের নামে বিএনপি যে সহিংসতা চালাচ্ছে, সে তথ্যও বিদেশি বন্ধুদের কাছে পৌঁছাতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৮ নির্বাচনের আগে তাদের আমরা এতটা অ্যাক্টিভ দেখিনি, যতটা এবার অনেক আগে থেকে তারা অ্যাক্টিভ হয়েছেন। আমি চাইব একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, যেখানে সব দল আসবে। আমরা তো কাউকে পালকি পাঠিয়ে নির্বাচনে আনবো না।’
এতদিন সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বললেও এবার জাতিসংঘের অধীনে ভোটের কথা তুলেছেন ১৪ মার্কিন কংগ্রেসম্যান। এ ধরনের চিঠিতে সরকার চিন্তিত কিনা, জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘তাদের ভুল ধারণা ভাঙাতে বাংলাদেশ দূতাবাস কাজ করছে।’
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘চিঠিগুলাকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছি না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আমাদের কয়েকটি খুবই গঠনমূলক বৈঠক হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে সফরগুলো হয়েছে তাতে তাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল, যে বিষয়গুলো আমরা আলোচনা করেছি, যেসব জায়গায় আমরা উন্নতি করেছি তারা অ্যাপ্রিসিয়েট করেছেন।’
বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মসূচি চলাকালে সহিংসতার ছবি টুইট করে তাতে মার্কিন কংগ্রেসম্যানকে ট্যাগ করেছেন শাহরিয়ার। এটি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা হলেও বিরোধীদের নৈরাজ্যের চিত্র পশ্চিমাদের কাছে পৌঁছাতে চায় সরকার।
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমাদের দূতাবাস সেই কংগ্রেসম্যান এবং সিনেটের কাছে এই ঘটনাগুলো পৌঁছে দিচ্ছে।’