১৫ জুলাই ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিরোধ নব্বইয়ের দশক থেকেই। এরপর মাঝখানে জাতীয় সংসদের চারটি নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও বাকিগুলো অনুষ্ঠিত হয় দলীয় সরকারের অধীনে।
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এবারও নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে নিজ নিজ অবস্থানে অনঢ় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। দুদলই নারাজ ছাড় দিতে। আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান খোঁজার যে প্রস্তাব দেশ-বিদেশ থেকে আসছে, তা প্রত্যাখ্যান না করলেও সরাসরি হ্যাঁ বলছে না দুই দলের কেউই। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কৌশলি উত্তর দিচ্ছেন নেতারা। তারা রাজপথে শক্তির মহড়া দেখানোকেই বেছে নিচ্ছেন সমাধান হিসেবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনীতির জন্য রাজপথ উপযুক্ত হলেও এই মুহূর্তে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনায় বসতে হবে। কেননা, নির্বাচনের আর ছয় মাস বাকি। এমন সময় নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে রাজপথে শক্তির মহড়ার বদলে আলোচনার টেবিলই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। উত্তোরণ ঘটাতে পারে চলমান রাজনৈতিক সংকটের। প্রতিহত করতে পারে সম্ভাব্য সংঘাত। সে কারণে সংলাপ বা আলোচনার টেবিলই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নির্ধারণে রাজনীতিবিদদের জন্য সুপথ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সবশেষ শেখ হাসিনার অধীনে ছাড়া নির্বাচন নয়- এই এক দফা দাবিতে চলে গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আর বর্তমান সরকারের পদত্যাগের পর নির্বাচন- এই এক দফা দাবি আদায়ে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি।
তাহলে এভাবেই কি আটকে থাকবে রাজনৈতিক সমঝোতা? সংঘাত কি অনিবার্য? সংলাপ বা আলোচনার মধ্য দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ কি আরও কঠিন হয়ে পড়ছে?
গত বুধবার ঢাকায় কাছাকাছি দূরত্বে দুই দলের সমাবেশ থেকে ‘পাল্টাপাল্টি এক দফা’ ঘোষণার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে এসব প্রশ্ন।
যদিও বৃহস্পতিবার ঢাকায় দিনভর প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার বিয়ক আন্ডার সেক্রেটারি আজরা জেয়া বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ সমর্থন করে।
এর আগেও বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সংলাপের তাগিদ দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে। আর রাজনৈতিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে নির্বাচন ইস্যুতে দল দুটির সমঝোতা জরুরি। কেননা- এ দুই দলের দুই বলয়ে বিভক্ত হয়ে আছে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল।
তবে বিশেষজ্ঞরা এখনও আশা দেখছেন। বলছেন, সমঝোতা-সংলাপ বা আলোচনার দুয়ার এখনো খোলা আছে। সে সুযোগ রয়েছে। নজিরও আছে।
আলোচনার পথ এখনও রুদ্ধ হয়ে যায়নি বলে মন্তব্য করে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা- এ দুটি বিষয়কে রাজনীতিবিদরা একমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেরা আলোচনার টেবিলে বসে সংকটের সমাধান করতে হবে। এটা পারলে রাজনৈতিক রুদ্ধশ^াস পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
আর রাজনীতিতে অনড় অবস্থানের কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই সমস্যার সমাধান খুঁজে নিতে হবে।’
তিনি বলেন, রাজনৈতিক শক্তিগুলো যখনই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখনই অন্য কেউ ক্ষমতার দিকে ঝুঁকে সেটা কাজে লাগাতে চায়। এ জন্য বর্তমানে রাজনীতিবিদদের বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে ধরনা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে সংলাপ নিয়ে আজরা জেয়ার তাগিদ দেওয়ার পরদিন গতকাল এক অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘সংলাপ হতে পারে, তবে তা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে।’
তথ্য মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ আহ্বানের ব্যবস্থা করতে তৎপরতা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, সংলাপ বিষয়ে এ পর্যন্ত বিএনপি নেতারা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের আস্থার সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
যদিও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যেই ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেনাসমর্থিত অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা দখল করে রাখে। ২০১১ সালে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত হওয়ার পরে আবারও নির্বাচন নিয়ে দু’পক্ষের বিরোধ রাজপথে চলে আসে।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও কারচুপির অভিযোগ তুলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেয় দলটি। শুরু থেকেই এই বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাতিসংঘসহ নানা বিদেশি শক্তি ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দু’পক্ষের সমঝোতায় ঢাকা এসেছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। এবার নির্বাচনের আগে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের তৎপরতা রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি।
তবে দুই দলের কাছেই এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দুই দলের ক্ষমতার লড়াইয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট কাজ করছে। ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবারের নির্বাচনকে আওয়ামী লীগের কাছে একতরফা ছেড়ে দিতে চায় না।
দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের দল বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। এবার আন্দোলনে মানুষের সমর্থন বেড়েছে, একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিএনপির নেতারা মনে করেন, তারা যদি এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারেন এবং আওয়ামী লীগ আবারও একতরফা নির্বাচন করার সুযোগ পায়, তাহলে দল বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের সংকটটা ভিন্ন। দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, টানা তিন মেয়াদে সরকারে থাকা দলটি ক্ষমতার বাইরে গিয়ে প্রতিহিংসার শিকার হতে পারে বা সংকটের মুখে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা তাদের মধ্যে রয়েছে। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা শাসনে বিরোধী দল ও বিরোধী মত দমনের নানা অভিযোগ করে আসছে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল। ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দলটিকে এখন সব ধরনের উপায় খুঁজতে হচ্ছে।
ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে যে ধরনের চিন্তা কাজ করছে, তাতে রাজপথে এক পক্ষের আরেক পক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টাই এখনো দেখা যাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন। গণ-আন্দোলনের মুখে জেনারেল এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র আবার প্রতিষ্ঠা হয়। সেই থেকে মাত্র একবার ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল। এ ছাড়া অন্য সব নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা বিরোধ দেখা গেছে নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে।
অতীতে নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে অন্তত তিনবার দুই প্রধান দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে আলোচনা কিংবা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার মধ্যে দুবার হয়েছে বিদেশিদের মধ্যস্থতায়। কিন্তু সেসব আলোচনা বা সংলাপ সফল হয়নি।