১ জুলাই ২০২৩
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : এক দিনে সুনামগঞ্জে ১৫০ মিলিমিটার ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে ১৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, চেলা, সুরমাসহ সবকটি নদ-নদী ও হাওরে পানি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সুনামগঞ্জের হাওর ও সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষ বন্যার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ পয়েন্টে শূন্য দশমিক ২৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার শূন্য দশমিক ৪২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ জেলার ৬টি স্টেশনের মধ্যে ৪টি স্টেশনেই পানি কিছুটা বেড়েছে এবং ২টি স্টেশনে পানি সামান্য কমেছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ পয়েন্টে শূন্য দশমিক ২৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার শূন্য দশমিক ৪২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে অর্থাৎ ৭ দশমিক ৩৮ সেন্টিমিটার উচ্চতায় সুরমা নদীর প্রবাহিত হচ্ছে।
আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এ সময় এ অঞ্চলের কিছু নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস
জেলার ছাতক পয়েন্টে পানি বেড়েছে দশমিক ১৭ সেন্টিমিটার। বর্তমানে বিপদসীমার দশমিক ৪৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে অর্থাৎ ৮ দশমিক ৫৭ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে সুরমার পানি।
দিরাই উপজেলার পুরাতন সুরমা নদীর পানি শূন্য দশমিক ৩ সেন্টিমিটার বেড়ে ৬ দশমিক ১৬ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে, যা বিপদসীমার শূন্য দশমিক ৩৯ সেন্টিমিটার নিচে।
জেলার তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পানি ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে শূন্য দশমিক ৪৪ সেন্টিমিটার কমে ৬ দশমিক ৫৬ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে, যা বিপদসীমার ১ দশমিক ৪৯ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।
এছাড়াও জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার নলজুর নদীর পানি শূন্য দশমিক ১ সেন্টিমিটার কমে ৬ দশমিক ৫২ সেন্টিমিটার উচ্চতায় এবং তাহিরপুর উপজেলার পাটনাই নদীর পানি শূন্য দশমিক ৩৪ সেন্টিমিটার বেড়ে ৬ দশমিক ৪৮ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
ফলে কয়েকটি উপজেলায় সড়কও পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা শহরে আসতে গিয়ে কোনো কোনো সড়কে মানুষজন নৌকা দিয়ে পাড়া পাড় হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলের পানি বৃদ্ধি পাওয়ার জেলার হাওর পাড়ে ও সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী কয়েক লক্ষাধিক মানুষ গত বছরের বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২৮ জুন সুনামগঞ্জে ৭২ মিলিমিটার, ২৯ জুন ১১৭ মিলিমিটার, ৩০ জুন ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত এক মাসে (জুন) সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৩১৬ মিলিমিটার। যা সারাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সকল নদ-নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবহাওয়া সংস্থা সমূহের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৭২ ঘন্টায় দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এ সময় এ অঞ্চলের কিছু নদ-নদীর (যাদুকাটা, সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরি) পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যনগর উপজেলার মহেষখলা গ্রামের বাসিন্দা অজিত কুমার বলেন, মেঘালয় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় ঢলের পানি, মধ্যনগর উপজেলার, বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকায় প্রবলবেগে প্রবেশ করছে।
জরুরি প্রয়োজনে তাহিরপুর উপজেলা থেকে জেলা শহরে আসা মেহেদী হাসান বলেন, জেলার সঙ্গে বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ারখলাসহ কয়েকটি অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও জেলার হাওর পাড়ের সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভেঙে ভেঙে কষ্ট করে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে পৌঁছাতে হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, সুনামগঞ্জ ও ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জের লাউড়েরগড় পয়েন্টে ১৪১ মিলিমিটার, ছাতকে ৩০ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জে ১৫০ মিলিমিটার এবং দিরাইয়ে ২১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ০.৪৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় সুনামগঞ্জে ১৫০.০ মিলিমিটার এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে ১৩১.০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী ৭২ ঘন্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী জানান, বন্যার আশংঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা মজুদ রয়েছে এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।