৮ মার্চ ২০১৮
এডভোকেট কয়ছর আহমদ : সময়ের প্রয়োজন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নারী মুক্তির প্রতীকী এ নারী দিবস। ৮ই মার্চ, ২০১৮ খ্রী: ১০৮তম আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বৎসর এ দিন পালিত হয় নানা আনুষ্ঠানিকতা, র্যালী, সভা, সেমিনার, কর্মসূচি ও প্রত্যয়ের মাধ্যমে। ১৮৫৭ খ্রী: ৮ই মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূঁচ কারখানায় নারী শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থাৎ মজুরীর অসমতা নিবারণ এবং দৈনিক ১২ ঘন্টা কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়, সূঁচিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পটভূমি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১০ খ্রী: ডেনমার্কের রাজধানী কোপেন হেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মান নেত্রী কারাজেট কিন ৮ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবসের ঘোষণা দেন। বেসরকারীভাবে প্রথম দিবসটি পালিত হয় ১৯১১ খ্রি:। ১৯৮৪ খ্রী: জাতিসংঘ নারী দিবসের স্বীকৃতি দেয়। সদস্য রাষ্ট্রসহ বিশ্বময় সরকারী বেসরকারী উদ্যোগে দিবসটি ধারাবাহিকভাবে পালনের মাধ্যমে ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।
আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে পালনের ধারাবাহিকতায় প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯০৮ সালে মেক্সিকো সিটিতে, দ্বিতীয় নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯১০ সালে কোপেন হেগেনে, তৃতীয় সম্মেলন নাইবোরীতে এবং চতুর্থ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় গণচীনের বেইজিং এ। বিশ্বের বঞ্চিত নারী সমাজের দাবি, অধিকার প্রতিষ্ঠা মূল্যায়ন, সমস্যা রোধকরণ ও সচেতনতার বার্তা নিয়ে নারী দিবসের যাত্রা। নারী সম্মেলনে সমঅধিকার, প্রকৃত মর্যাদা, নারী স্বাধীনতা অর্থাৎ নারী সমাজের উত্তরোত্তর উন্নতি অগ্রগতি বিষদ আলোচনা সহ সমস্যা সমাধানের আলোচনা হয়। নারী অধিকারের অন্তরায় হিসেবে ১২টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশে মহিলা পরিষদ কর্তৃক প্রথম নারী দিবস পালিত হয়। ১৯৭৯ খ্রি: ঘোষিত হয় সিডও সনদ। দেশের মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে, সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, স্বনির্ভর হচ্ছে, আপন গতিতে সর্বত্র এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নারী সমাজ ছিল করুণ আর নিষ্ঠুরতার শিকার। সেকেলের পরাশক্তি খ্যাত পারস্যবাসীর চরিত্র নৈতিকতা ছিল নিকৃষ্টতম। পিতা কন্যাকে, ভাই বোনকে স্ত্রী করা দোষনীয় ছিল না। স¤্রাট দ্বিতীয় ইয়াজদিগার নিজ ঔরষজাত কন্যাকে বিবাহ এবং পরে হত্যা করে। মুয়াদা প্রচার চালায় রমনী ও তার ধন সম্পদে সবার অধিকার আছে। স¤্রাট কোব্বাদ ছিল এ মতবাদের অগ্রনায়ক। সেকেলের রুমের অবস্থা ছিল প্রায় একই। নারী ছিলো অধিকার হারা, নির্যাতিত, ভোগের বস্তু উত্তরাধিকারহীন। ইয়াহুদী মেয়েদের দাসী পর্যায়ে রাখা হতো। ভাই বিদ্যমানে বোন উত্তরাধিকারী হতে বঞ্চিত হতো। প্রাচীন ভারতে ছিল সতীদাহ নামক জীবন্ত আত্মদানে বাধ্য করা সহ আরো কতো অনিয়ম।
মা কোন একাডেমি পঞ্চম শতাব্দীতে ‘নারীর দেহে আত্মা আছে কি-না’ উপর গবেষণা চালায়। ৫৭০ খ্রী: ফ্রান্সে নারী মানুষ বিবেচিত কি-না এজান্ডা নিয়ে এক সম্মেলন হয়। সিদ্ধান্ত আসে নারী মানুষ, তবে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পুরুষের সেবা করা। উল্লেখ্য পাশ্চাত্য খৃষ্ট ধর্মযাজকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এবং এর আগে নারীরা মানুষের স্বীকৃতি পায়নি। ১৮০৫ খ্রী: পর্যন্ত বৃটিশ আইনে স্ত্রী বিক্রির অধিকার স্বামীর ছিলো। মূল্য ছিল ছয়পেনি। ১৯১৮ খ্রী: পূর্বে তাদের ভোটাধিকার ছিলো না। ১৯৩৮ খ্রী: পর্যন্ত ফরাসী নাগরিক আইনে ছিল নারী শিশু পাগল অধিকার ও দায় দায়িত্বহীন। প্রাক ইসলামী যুগে আরব বিশ্বে নারীদের দুঃখ দুর্দশার সীমা ছিলো না। সম্পত্তিতে পুরুষদের একক অধিকার ছিলো। যুদ্ধের ময়দানে নারীদের পাশবিক নির্যাতন করা হতো। বিবাহের মোহরানা পেতেন পিতা। মেয়েরা ছিলো ঘৃণা অবহেলা উপেক্ষার পাত্র। এমনকি মেয়ে সন্তান জন্মের পর জীবন্ত কবর দেয়ার ঘটনা ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার। পরবর্তী পর্যায়ে ইসলামী বিধি বিধান সর্বক্ষেত্রে যেমনি ইনসাফ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে, তেমনি নারী অধিকার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পৃথিবীকে গড়ে তুলে নর-নারীর শান্তির নীড়। আলোকিত জীবন ব্যবস্থা।
সাম্প্রতিক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সভ্য ও আধুনিক খ্যাত ইউরোপ আমেরিকার নারীরাও সুখী নয়। আধুনিকতা, নারী স্বাধীনতা, প্রগতির নামের বাহারী ছদ্মাবরণে নারীকে পণ্যের ন্যায় ব্যবহার করছে এক শ্রেণির মতলববাজ পুরুষেরা। বৃদ্ধি পাচ্ছে হত্যা, নারী হত্যা, আত্মহত্যা, বিচ্ছেদ, ধর্ষণ, অহরহ নির্যাতন, সামাজিক, নৈতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ সহ পারিবারিক বন্ধন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। তেমনি যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার লড়াই সামরিক হস্তক্ষেপ, পুলিশী এ্যাকশন নারী সমাজকেও করছে হত্যা, পঙ্গু, সন্তানহারা থেকে বিধবা, আশ্রয়হীনা।
বিশ্বের সাথে সঙ্গতি রেখে আমাদের দেশে প্রতি বৎসর পালিত হয় নারী দিবস। গৃহিত হয় সরকারি বেসরকারী পর্যায় ব্যাপক কর্মসূচি। এসব আয়োজনের ক্ষেত্রে বেশির ভাগই দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির সুবিধাভোগী নারী আর পুরুষ। তাদেরকে এসব অনুষ্ঠানে ওলট পালট দৃশ্যমান হয়। তেমনি নারী সুবিধা, কোটা, চাকুরী, প্রতিনিধিত্ব নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে কুক্ষিগত করা হয়। সহজ সরল আম নারী সহ নির্যাতিতরা হয় বঞ্চিত। এরূপ গ্রাম্য সালিশ, বিচার, মিথ্যা মামলা হয়রানী, যৌন হয়রানী নির্যাতন ইত্যাদি অর্থ রাজনৈতিক আর প্রভাবশালী মহলের প্রভাবে গরীব অসহায় নারীরা নির্যাতিত, খুন, ধর্ষণ, লাঞ্চনা, গঞ্জনা সহ যৌতুকের বলি। বিচার বিনে বা প্রহসনে ধোঁকে ধোঁকে মরছে। এ যেন তাদের করুণ প্রাপ্য। তাদের ক্ষেত্রে বিশ্ব নারী দিবসের সব ডাক হাক নিষ্প্রয়োজন। এসব অনুষ্ঠান যেন আত্মকেন্দ্রিক, লোক দেখানো, নাম ফাটানো বেফাস বুলি, যা সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার। এখনই এর মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয়ভাবে দলমত নির্বিশেষে নারীর অধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা একান্ত আবশ্যক। প্রয়োজন আম নারী সমাজের দারিদ্র্যতা রোধ, শিক্ষা, সচেতনতার উন্মেষ, আর নারী জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে, পুরুষের প্রতিযোগী, সহযোগী হিসেবে সমান্তরালভাবে। লড়াইয়ের বা প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসেবে নয়। পরিবার সমাজ ও দেশে তাদের ইতিবাচক তৎপরতায় এগিয়ে যাক অগ্রগতির শিখরে। সেখানে থাকবে নারী পুুরুষ যুগ্ম অবস্থানে।
আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৮% নারী সমাজ। অশিক্ষিত অল্প শিক্ষিত, নারীদের গৃহ পরিচারিকা, শ্রমিক ইট ভাঙ্গা সহ কঠিন কাজে অল্প বেতন বা মজুরীতে দু’মুটো অন্ন জোগাড় কঠিন হয়ে যায়। গৃহস্থালী কর্ম, সন্তান জন্ম, লালন পালনতো আছেই। এরই সাথে সমাজের চাপ, কুসংস্কার, অসৎ ব্যক্তিবর্গের দৌরাত্ম, বঞ্চিতদের কলাকৌশলের নিত্য নতুন খবরাখবর প্রায়ই শ্রুত হচ্ছে। দেশে নারী শিক্ষা কিছুটা উন্নত হলেও নৈতিক দিক নি¤œগামী। আধুনিক কর্মমূখী শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে নারী শিক্ষা বিকাশ অপরিহার্য। নারী শিক্ষার অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত, সচেতনতা, নিরাপত্তা ও শালীনতাবোধ নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী নির্যাতন রোধে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। সে সাথে আইন-শৃঙ্খলা অবশ্যই কার্যকর থাকতে হবে। সবাইকে উগ্রতা পরিহার করত: সর্বত্র সজাগ সচেতন ও সতর্ক অবস্থান প্রয়োজন।
একথা সত্য যে দেশে নারী অধিকার, নির্যাতন রোধে আইনের কমতি নেই। প্রচলিত ও সাধারণ আইনের সহিত নারী নির্যাতন রোধ অধ্যাদেশ, যৌতুক নিরোধ, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ সহ বহুবিধ আইন আদালত, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্রীয়, সামাজিক তৎপরতা প্রচার সবই বিদ্যমান আছে। সুন্দর সুন্দর বাণী আর কর্মসূচির কমতি নেই। তদুপরি নারী নির্যাতনে বাস্তবতা হচ্ছে বেড়েই চলেছে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাঙ্গণ, কর্মক্ষেত্র, যাত্রী, পদযাত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে নারীতে বটেই শিশু কিশোরীরাও রেহাই পাচ্ছে না। কখনও খবর হয়, কখনও নিস্তব্দ, কখনও বিচারে আসে কখনও প্রভাবিত, এমনকি বিপরীতও হয়ে বসে। এজন্য এক ধরনের ঘাপটি মেরে বসা মতলববাজ পুরুষরা যেমনি দায়ী তেমনি একশ্রেণির উগ্র মহিলাদের অশালীনতা, আড্ডা ও বেপরোয়াকে উপেক্ষা করা যায় না। বিশিষ্ট লেখক, সাহিত্যিক সাংবাদিক মরহুম লুৎফর রহমান একবার বলেছিলেন, ‘নারীর স্বাধীনতা সম্পর্কে অনেক কথা বলেছি, নারী স্বাধীনতার অর্থ নারী শক্তিকে জাগিয়ে তোলা। তাদের শিক্ষিত করা, তার হাত, পা মুখের ব্যবহার করতে দেয়া। বাইরের কুক্রিয়া শক্ত পুরুষ সমাজের বা অশ্লীল উদ্দেশ্য ঘুরে বেড়ানো নারী স্বাধীনতা নয়। আজ তার যেমন মূল্যায়ন প্রয়োজন, তেমনি সাধুরূপী কু-মহলের কবল মুক্ত থাকা আবশ্যক। কারোই উগ্রতা নয়, শালীনতা নৈতিকতা আর পরস্পর শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত অতি জরুরী।
সুখী সমৃদ্ধ সমাজ, দেশ এবং শান্তির নীড় বিশ্ব বিদ্যমানে নারী পুরুষের যৌথ ভূমিকা কার্যকর উদ্যোগ আবশ্যক। তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতিতে তা আরও গুরুত্ববহ। আন্তর্জাতিক কর্র্মদিবস’ নামে নারী দিবস যাত্রা করে একটি প্রতিপাদ্য বিষয় সামনে রেখে সাড়া জাগানোও জনপিয় তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা সত্য যে নারী পুরুষ কেহ কারো প্রতিপক্ষ নয়, পরিপূরকও সহায়ক বটে। নারী মুক্তির সাথে জাতি মুক্তি চায়। চায় সুশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার পরিবেশন এবং নিরাপত্তা। নারীরা স্বীয় যোগ্যতা, দক্ষতা কর্মতৎপরতায় এগিয়ে যাচ্ছে, যাবে। কারো অতি করুণা, দয়া বা কথিত কোটায় নির্ভরতা তাদের আত্মসম্মানে নেতিবাচক ধারণা আসবে। চায় বঞ্চিত মানুষের সমঅধিকার, ভারসাম্য এবং মর্যাদা পূর্ণজীবন। কারো দাবার গুটি যেমনি নয় তেমনি উগ্রতা কাম্য নয়। নারী নির্যাতন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা সহ বিশ্বনারী দিবসের সব আয়োজন যেন তাদের সহায়ক আর কল্যাণকর হয়। এগিয়ে যায় অভিষ্ট লক্ষ্যে। ছড়িয়ে যাক বিশ্বময় আপন গতিতে। এর নিরব সরব আহবানে জেগে উঠুক নারী পুরুষ নির্বিশেষে। বিশ্ব নারী দিবসের সকল কর্মসূচি সফল হোক, সার্থক হোক। জয় হোক নারীদের, জয় হোক মানবতার। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে মমতাময়ী নারী সমাজের প্রতি রইল শ্রদ্ধা, অভিনন্দন, অফুরন্ত ভালোবাসা।
(লেখক : আইনজীবি, কলামিস্ট।)