২৫ মে ২০২৩


বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন আজ

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : সাম্যের কবি, বিরহ ও বেদনার কবি, বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৪তম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি ছিলেন একাধারে প্রেমিক ও বিদ্রোহী। উপন্যাস, নাটক, সঙ্গীত আর দর্শনেও নজরুলের অনবদ্য উপস্থিতি বর্ণাঢ্য করেছে বাংলা সাহিত্যকে। কণ্ঠশিল্পী, অভিনেতা, সম্পাদক পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভিমানী এই মানুষ হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন নিপীড়িত-অসহায়ের আর্তি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কবিতা কোটি তরুণের রক্তে জ্বালায় স্ফুলিঙ্গ।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সিলেট নজরুল পরিষদের আয়োজনে নগরীর রিকাবীবাজারসস্থ কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের মুক্তমঞ্চে জাতীয় কবির প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আয়োজক সংগঠন সিলেট নজরুল পরিষদ, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট, নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদ সিলেট বিভাগ, কথাকলি সিলেট, সিলেট ললিতকলা একাডেমি, শ্রুতি সিলেট, ছন্দ নৃত্যালয় সিলেট, মুক্তিযুদ্ধ অনুশীলন ও মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার, লিটল থিয়েটার, সিলেট, রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, সিলেট, নৃত্যশৈলী সিলেটসহ বিভিন্ন সামাজিক,সাংস্কৃতিক বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।

পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি রজত কান্তি গুপ্ত। বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী হিমাংশু বিশ্বাসের নেতৃত্বে সিলেটের সকল সংগীত শিল্পীদের নিয়ে নজরুল সংগীত দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান শেষ হয়।

এসময় বক্তারা বলেন, ‘বাঙালি জাতিকে কবিতার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে এদেশের নিপীড়িত, শোষিত ও নিষ্পেষিত মানুষের মুক্তির কথা বলে গেছেন তিনি। এজন্য তিনি জাগরণের কবি, মুক্তির কবি। আজীবন সাম্যের গান গেয়েছেন। ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের মধ্যে সাম্য ছিল তার লেখনির মূল প্রতিপাদ্য। পরাধীনতার শিকল ছিঁড়ে কীভাবে আপন শক্তিতে জ্বলে উঠতে হয়, তা জাতিকে শিখিয়েছিলেন তিনি। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালি জাতি থাকবে, ততদিন তার সাহিত্যকর্ম প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।’

কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (ইংরেজি ২৪ মে ১৮৯৯ সাল) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাযারের খাদেম। নজরুলের তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন এবং দুই বোনের মধ্যে সবার বড় কাজী সাহেবজান ও কনিষ্ঠ উম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”। নজরুল গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। মক্তবে (মসজিদ পরিচালিত মুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে তার পিতার মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে হয় তাকে। এসময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে হাজি পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াযযিন (আযান দাতা) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যকর্মে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তিনিই বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চেতনার চর্চা শুরু করেছেন বলা যায়। শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের জীবনের পরতে পরতে সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। তিনি জড়িয়েছিলেন নানা পেশায়। ১৯১৭ সালে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। অংশ নেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও।

এরই মাঝে তৎকালীন প্রভাবশালী কবি-সাহিত্যিকদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। ১৯২২ সালে প্রকাশ করেন ধূমকেতু পত্রিকা। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য নজরুলকে দেওয়া হয় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। মাত্র ২২ বছর ব্যাপ্তির লেখক জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় ৩ হাজার গান, লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস।

সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীত ও চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন নজরুল। নিজের পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’তে অভিনয়ও করেছিলেন। তাই শুধু কবি পরিচয়েই আবদ্ধ নন নজরুল। আসানসোলের রুটি বানানো ছেলেটা এখনও বিশাল এক প্রতিষ্ঠান। না থেকেও যার উপস্থিতি প্রতিদিন।

১৯৭২ সালে কবি নজরুলকে সপরিবারে নিয়ে আসা হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন এই মহাবিদ্রোহী ও প্রেমিক পুরুষ। কবির ইচ্ছানুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

শেয়ার করুন