৬ মার্চ ২০১৮


মাজহাব বিরোধী প্রচারণায় ৫ বছর আগে গ্রাম ছাড়ে ফয়জুল

শেয়ার করুন

দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনায় আটক ফয়জুল হাসান শৈশবেই কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। দিরাই উপজেলার তারাপাশা মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণীর পড়ালেখা শেষ করে ভর্তি হয় ধল দাখিল মাদ্রাসায়। মেধাবী ছাত্র হিসেবে ফয়জুল ২০১১ সালে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে এবছরেই জেডিসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৭৮ পাশ করে। এরপর ২০১৪ সালের দাখিল পরীক্ষায় ফয়জুল জিপিএ ৪.৫৬ পেয়ে উত্তীর্ন হয়।

দাখিল পাশ করার পর সে কোথায় ভর্তি হয়েছে তা আর জানা যায়নি। তবে এলাকার লোকজন জানান গত তিন চার বছর ধরে সে মাঝে মাঝে এলাকায় এসে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতো। তার পরিবারের মধ্যে দুই চাচা আব্দুল জাহের ও আব্দুল কাহার আহলে হাদীসের অনুসারী। তারা দীর্ঘদিন যাবত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে থাকেন । আনুমানিক ৫ বছর পুর্বে মাজহাব বিরোধী মতাদর্শ নিয়ে কথা বার্তা বলতে গেলে মুসল্লীদের বাঁধায় মসজিদ থেকে বের হয়ে আসার পর আর সে আর গ্রামের বাড়ীতে যায়নি।

হামলাকারী ফয়জুল হাসানের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কলিয়ার কাপন গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের একেবারে দক্ষিনে লম্বা দুটি দালান বিশিষ্ট বসতঘরের আলাদা বাড়িতে পরিবারের কোন লোক জন নেই। সবগুলি কক্ষ তালা বদ্ধ। পাশের বাড়িটি ফয়জুলের ফুফুর বাড়ি। সেই বাড়িতে গিয়ে তার ফুফু রেহেনা বেগমের সাথে কথা বললে তিনি প্রথমে কান্না কাটি শুরু করেন।

পরে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে তিনি বলেন তবে তার ফুফু রেহেনা বেগম জানান, ৫ ভাই ও চার বোন তাদের। ফয়জুল হাসান এর পিতা হাফিজ মাওলানা আতিকুর রহমান পরিবার নিয়ে সিলেটে থাকেন।এলাকায় যিনি হাফিজ কুরেশ আলী নামেই বেশি পরিচিত। ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে রয়েছে হাফেজ কুরেশ আলীর। এদেও মাঝে ফয়জুল ৩য় সন্তান। ফয়জুলের বড় ভাই ভাই এনামুল হাসান বর্তমানে ঢাকায় চাকুরীরত। মেঝো ভাই আবুল হাসান কুয়েত প্রবাসী। ফয়জুল হাসান এর পিতা পরিবারসহ সিলেট শহরতলিতে বসবাস করেন। বছর খানেক আগে সিলেট শহরতলীর কুমারগাঁও এলাকায় শেখপাড়ায় নিজস্ব বাসা তৈরি করে তার পরিবার। এর পর থেকে এখানেই বসবাস করছিল ফয়জুল। সে নগরীতে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করত। সিলেটে পরিবারসহ বসবাসের ফলে গ্রামের বাড়ী কলিয়ার কাপনে তার যাতায়াত কম ছিল।

কলিয়ার কাপন গ্রামের বাসিন্দা জগদল ইউপির সাবেক সদস্য আব্দুষ শীষ জানান, পারিবারিক ভাবে ফয়জুলের দাদা এলাকায় একজন ভাল লোক হিসেবে সবাই জানতো।ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে মত ভিন্নতার কারণে ফয়জুল হাসানের আপন চাচা জাহার মিয়াকে ভাতিজার মতো গ্রামের মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা। বর্তমানে জাহার কুয়েত প্রবাসী। গ্রামের বাসিন্দা যুবলীগ নেতা লুৎফুর রহমান চৌধুরী জানান জাহারের পথ ধরেই ভাতিজা ফয়জুল তার মতাদর্শ গ্রামের মসজিদে প্রচারনার চেষ্টা চালায়। আমরা সাভাবিক যে নিয়মে মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায় করি তারা সে নিয়মে নামাজ পড়েনা। এ নিয়ে গ্রাামের মুসল্লীদের প্রবল বাঁধায় চাচা-ভাতিজা দুজনকেই মসজিদ আসতে নিষেধ করা হয়।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা ইউপি আওয়ামীলীগ সভাপতি মিজানুর রহমান ছোবা মিয়া বলেন , গ্রামবাসীর বাঁধায় তারা চাচা ভাতিজা গ্রাম ছাড়া হওয়ার পর মাঝে মাঝে ফয়জুল লুঙ্গি গামছা বিক্রির ভান ধরে গ্রামে আসতো।

কলিয়ার কাপন জাসেম মসজিদের ইমাম হাফেজ হাবিবুর রহমান জানান, আমি তিন চার বছর থেকে এ মসজিদে ইমামতি করছি।শুনেছি ফয়জুল হাসান ও তার দুই চাচা মাজহাব বিরোধী প্রচারনা চালালে সুন্নী মতাবলম্বী মুসল্লীগন তাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করেন। এরপর তারা আর নামাজ পড়তে আসেনি।

এদিকে অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের উপর ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হামলাকারীর ছবি ভাইরাল হলে প্রত্যন্ত হাওর এলাকা কলিয়ার কাপনে তোলপাড় শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজন হামলাকারী ফয়জুল কলিয়ার কাপনের বাসিন্দা বলে শনাক্ত করেন। এলাকার একটি ছেলে একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদের উপর এমন ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনায় এলাকাবাসী প্রতিবাদ জানিয়ে রোববার দুপুর ১২ টায় কলিয়ার কাপন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

মানববন্ধনে বক্তারা ন্যাক্কার জনক ঘটনাকারী ফয়জুলের শাস্তি দাবী করে বলেন, এ ঘটনায় তার সাথে আর কারা জড়িত সে কোথা থেকে এই হামলার মদদ পেয়েছে তা উদঘাটন করে নেপথ্য নায়কদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তারা আরো বলেন , ফয়জুল হলো কলিয়ারকাপন তথা দিরাইয়ের জন্য কলঙ্ক।

দিরাই থানার ওসি (তদন্ত) এবিএম দেলোয়ার হোসেন বলেন, ফয়জুলের পিতা সিলেটে বসবাস করলেও সে মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতো। সে এলাকায় ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতো, এর বেশি আর কিছু জানা যায়নি। র‌্যাব -৯ সুনামগঞ্জের একটি দল ফয়জুল হাসানের বাড়ি থেকে রোববার ভোর ৫ টায় তার চাচা আব্দুল বাতিন কে আটক করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।

(আজকের সিলেট/৬ মার্চ/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন