১৪ মে ২০২৩
খলিলুর রহমান : সালাহ উদ্দিন রিমন। সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে একাধিকবার প্রতিদ্বন্ধিতা করেছেন, হেরেছেনও বিপুল ভোটে। সব শেষ আসন্ন সিসিক নির্বাচনেও তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হচ্ছেন। তবে অতীতের মতো কি তিনি এবারো পরাজিত হবেন, না সিলেটের বহুল আলোচিত ছক্কা ছয়ফুরের ন্যায় তিনি ছক্কা মারবেন? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নগরবাসীর মনে। নগরীর অলিগলি এমনকি প্রতিটি পাড়া মহল্লায় চায়ের দোকানে চলছে ভোটের ঝড়। এ নিয়ে সোস্যাল মিডিয়াতেও বইতে শুরু করেছে চুলছেড়া বিশ্লেষন।
রোববার তিনি মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। অপর ৬ জন প্রার্থী হলেন- মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী (আওয়ামী লীগ), নজরুল ইসলাম বাবুল (জাতীয় পার্টি), হাফিজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (হাত পাখা), মোহাম্মদ আবদুল হানিফ ওরফে কুটু (স্বতন্ত্র), মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান খান (স্বতন্ত্র) ও সামছুন নুর তালুকদার।
সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমার স্থায়ী বাসিন্দা সালাহ উদ্দিন রিমন একজ ক্ষুদে ব্যবসায়ী এবং সহজ সরল ও সাদা মনের মানুষ। হত-দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্টির মধ্যে থাকা মানুষটির দীর্ঘদিনের সখ সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) মেয়র হওয়ার। এই সুদৃঢ় সংকল্প নিয়ে তিনি এর আগেও এ পদে নির্বাচন করেছেন একাধিকবার। প্রয়াত মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সাথে করেছেন ভোটের লড়াই। নির্বাচিত হতে না পারলেও প্রতিবারই ভোট পেয়েছেন উল্লেখযোগ্য। তাই নগরের ছিন্নমূল ও গরীব-দুঃখী লোকজনের একান্ত ভালোবাসার মানুষ হয়ে উঠেছে সালাহ উদ্দিন রিমন ওরফে রিমন ভাই। ভোটারদের সেই আন্তরিক ভালোবাসাকে পুঁজি করে এবারও ভোটযুদ্ধে নেমেছেন সালাহ উদ্দিন রিমন। তাকে স্বাগতও জাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষজন।
এই অবস্থায় আসন্ন সিসিক নির্বাচনে কেউ কেউ তাকে বলছেন আরেক ছক্কা ছয়ফুর। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ১৯৯০ সালে ছয়ফুরের বিজয় অঘটনের কথা। আবার কেউ কেউ বলছেন রিমন হয়ে উঠতে পারেন সিলেটের হিরো আলম হয়ে।
আসন্ন সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে অনেকের ধারণা, সালাহ উদ্দিন রিমন এবার মেয়র পদপ্রার্থী হলে ছক্কা ছয়ফুর অথবা হিরো আলমের মতো চমক সৃষ্টি করতে পারেন।
কারণ হিসেবে তারা মনে করেন- শাসকদল আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মূলত সিলেট সিটির নাগরিক নন। তিনি সিলেটে তৃণমূল আওয়ামী লীগ থেকে উঠে আসা শাসকদলের কোন স্থানীয় নেতাও নন। বর্তমানে ব্যাপক হারে প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করতে চাইলেও সিলেট নগর ও নগরের সব অলি-গলি তাঁর পরিচিত নয়। যদিও তিনি বৃটেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, তিনি ইংলো-বাংলা বা ইংলো-সিলেট যৌথ নাগরিক। যদিও জন্ম ও বংশীয়সূত্রে তিনি সিলেটের ওসমানীনগর এলাকার বাসিন্ধা।
আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর দলীয় প্রার্থীতা নিয়ে শুরু থেকেই ছিল তুমুল বিতর্ক ও বিরেধীতা। শাসকদল সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ প্রথমত তাঁর প্রার্থীতা প্রত্যখ্যান করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেয়। একে একে তৃণমূল থেকে ওঠে আসা বাঘা বাঘা ১০ নেতাও নিজেদের অনুকূলে জমজমাট প্রচার-প্রপাগণ্ডা চালান। তাঁর বিপরীতে দলের মনোনয়ন ফরমও কিনেন। পাশাপাশি আনোয়ারজ্জামান চৌধুরীকে বহিরাগত বলে চালানো হয় ব্যাপক প্রচার ও প্রপাগণ্ডা।
সবশেষে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত নেকনজরে সিলেট সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে যান যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। এর পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আনুষ্ঠানিক ভাবে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে সমর্থন দিয়ে মাঠে নামলেও পূর্বের বিতর্ক প্রচারণা ও প্রপাগণ্ডা নগরের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কিছুটা হলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।
দ্বিতীয়ত সরকার বিরোধী বিএনপি জোটের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান, চলমান রাজনৈতিক ধরপাকড়, নেতা-কর্মীদের নামে মামলা দিয়ে হয়রানী ও আতংক সৃষ্টি, নির্বাচনী লেভেল প্লেনিং পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেনা বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে দুইবারের নির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর পুনরায় প্রার্থীতা নিয়ে ধূম্রজাল ও কুঠচাল, রাজনৈতিক ও দলীয় নির্বাচনে সত্যিকার বিরোধী কেনো দলের প্রর্থী না থাকা ইত্যাকার নানা করণে সাধারণ ভোটারের উৎসাহ-উদ্দীপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। এ অবস্থায় সাদা মনের মানুষ ও গরীব জনগোষ্টির প্রিয়পাত্র সালাহ উদ্দিন রিমনের প্রার্থীতার ঘোষনা নিয়ে নগরবাসীর মনে নতুন করে নতুন করে উৎসাহ ও উদ্দীপনার জন্ম দিতে শুরু করেছে বলে নির্বাচন বিশ্লেষকরা ধারনা করছেন।
আর এ ধারণাকে একেবারে অমূলক বলেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ আবেগপ্রবন জনগনের মধ্যে আবেগের বিস্ফোরণ হয়ে অনেক সময় ঘটে যায় বহু অঘটন। যেমনটা ঘটেছিল ১৯৯০ সালে সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আল্লাহর গোলাম ছয়ফুর রহমান ওরফে ছক্কা ছয়ফুরের পক্ষে। সম্প্রতি যেমনটা ঘটে গেছে বগুড়া-৪ সংসদীয় আসনের উপ-নির্বাচনে হিরো আলমের পক্ষে। যদিও হিরো আলমকে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হতে হয় ৮৩৪ ভোটের ব্যবধানে। তবে হিরো আলম এ পরাজয়কে মেনে নেননি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বহুল আলোচিত ছক্কা ছয়ফরের মূল নাম মো: ছয়ফুর রহমান। বাড়ি সিলট সদরের বর্তমান এয়ারপোর্ট থানাধীন ছালিয়া গ্রামে। তিনি ছিলেন নিজ গ্রামে থাকা ভাঙ্গা-গড়া এক খাবার হোটেলের বাবুর্চি ও পার্টটাইম ঠেলাগাড়ির চালক। এ বাবুর্চিই গড়ে তুলেছিলেন আবেগের স্মরণীয় এক ইতিহাস। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত কয়েকটি নির্বাচনে প্রার্থী হয়ছিলেন তিনি। ‘বাবুর্চি রাষ্ট্রপতি হতে চায়’ চট্টিখানি বইয়ের লেখক ও ছিলটী ভাষার মিষ্টভাষী বক্তা ছিলেন ছয়ফুর রহমান। সর্বশেষ ১৯৯০ সালে সিলেট সদর উপজেলা নির্বাচনে ঘটিয়েছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী অঘটন।
তৎকালীন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীমের নৌকা প্রতীককে ২২ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। নির্বাচনে ছয়ফুরের ডাবমার্কা পেয়েছিল ৫২ হাজার ভোট। আর ইফতেখার শামীমের নৌকা পেয়েছিল ৩০ হাজার ভোট। তখন অন্য কোনে দলের বাঘা বাঘা প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার ধারে কাছেও যেতে পারেননি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সম্ভাব্য সতন্ত্র মেয়র প্রার্থী সালাউদ্দিন রিমন বলেন, আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছি। জনগন সাথে থাকলে বিজয় হবে ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ্য, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট ৪২টি ওয়ার্ডের ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৬০৫ জন ভোটার নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নগরপিতা নির্বাচন করবেন। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৩ মে এবং ২১ জুন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।