৫ মে ২০২৩


সিলেটে ৩০ লাখ মে. টন ইরি-বোরো ধান উৎপাদন

শেয়ার করুন

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : সুনামগঞ্জ জেলার অন্যতম বৃহৎ হাওর চাপতি। গেল বছর ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে বাঁধ ভেঙে পুরো হাওরের ইরি বোরো ফসল তলিয়ে যায়। এতে ভেঙে যায় কৃষক শিব্বির আহমদের স্বপ্ন। হাওর তীরবর্তী গ্রাম মাটিয়াপুরের ওই কৃষক কষ্টের সোনালী ফসল ঘরে তোলার আশায় এবারও তার চিরচেনা চাপতির হাওরে ফসল আবাদ করেন। কিন্তু এবারের বাম্পার ফলন তার গেল বছরের সেই দুঃখ কষ্ট দূর করে দিয়েছে। তার মুখে এখন হাসির ঝিলিক। ইতোমধ্যে কাটা-মাড়াই শেষ করে ঘরে তুলেছেন ঘাম ঝরানো কষ্টার্জিত সোনালী ফসল।

একই হাওরের কৃষক নজির মিয়াও গেল বছর ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান। চাষাবাদের খরচ উঠানো দূরে থাক পরিবার পরিজন নিয়ে বড় কষ্টে দিনাতিপাত করেন। তবুও হাল ছাড়েননি। এবারও তার চিরচেনা চাপতির হাওরে আবাদ করেন। এবার অনুকূল আবহাওয়া নজির মিয়ার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এবার ফলন হয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। শিব্বির আহমদ আর নজির মিয়ার মতো চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের কৃষকদের ভাগ্য যেন ফিরে এসেছে। এবারের বাম্পার ফলনে তারা গত বছরের ক্ষতি অনেকটাই ভুলে গেছেন।

দেশে ধান উৎপাদনের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ জেলা সুনামগঞ্জে এবারের বাম্পার ফলনে কৃষাণ-কৃষাণীদের পাশাপাশি উৎফুল্ল সরকারের কৃষি বিভাগও। কেবল সুনামগঞ্জ নয়, সিলেট বিভাগের অন্য তিন জেলায়ও এবছর ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগের ৪ জেলায় চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধুমাত্র ধানের জেলা সুনামগঞ্জেই উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন ইরি-বোরো ধান।

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিলেট বিভাগে ৪ লাখ ৯০ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। আবাদকৃত জমি থেকে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি বিভাগ। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে। উৎপাদনও হয়েছে টার্গেটের চেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়ে গেছে। উৎপাদিত ধান থেকে ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যাবে। তবে,উৎপাদনের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

সিলেট জেলায় ৮৫ হাজার ১৫০ হেক্টর জমি থেকে ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৩৩ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়। মৌলভীবাজার জেলার ৬০ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হবে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ২২২ মেট্রিক টন ধান। হবিগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ২২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৩৮ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে।

আর ধানের জেলা খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন ইরি-বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিলেট জেলার হাওরের ইরি-বোরো ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হয়ে গেছে। উঁচু জমির ধান এখনো কাটার বাকি আছে। হবিগঞ্জ জেলায়ও হাওরের ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হয়ে গেছে। একইভাবে মৌলভীবাজার জেলার হাওরের ইরি বোরো ফসল ইতোমধ্যে শতভাগ কাটা হয়ে গেছে।

এ জেলায় কেবল কিছু উঁচু জমির ধান কাটার অপেক্ষায় আছেন কৃষকরা। হাওরে জমিতে ইরি বোরো ধান বেশি উৎপাদন হয়। হাওরে ধান আগে রোপণ করতে হয়, আবার আগে পেকেও যায়। হাওরের বাইরে কিছু উঁচু জমিতে শেষ সময়ে আবাদ করা হয়। বর্তমানে শুধু এ সকল উঁচু জমির ধান কাটা ও মাড়াইয়ের অবশিষ্ট রয়েছে। এবার সমানভাবে হাওরের জমি ও উঁচু জমিতে বাম্পার ফলন হয়েছে। অবশ্য ব্রি-২৮ জাতের ধানে এবার সকল হাওরেই চিটা হওয়ায় এ জাতীয় ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। উৎপাদন কম হয়েছে ব্রি-২৯ জাতের ধানেরও। এর বাইরে হাইব্রিড,উচ্চ ফলনশীল জাতের সকল ধানের ফলন গত বছরের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।

কৃষকরা জানান,এবার মোটা জাতের ধানের ফলন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সুনামগঞ্জের হাওরসমূহে প্রতি কেদার জমিতে মোটা জাতের ধান সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ২৭ মণ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় গত বছরের কষ্ট ভুলে কৃষকরা বেশ উৎফুল্ল।

কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলার উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, হাওরের ধান কাটা-মাড়াই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিছু উঁচু জমির ধান কাটার বাকি থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন,এগুলো উঁচু জমি। আমন ধান কাটার পরে ওই জমিতে মৌসুমের শেষ সময়ে ইরি-বোরো আবাদ করা হয়ে থাকে। তবে,উঁচু জমির পরিমাণ বেশি নয়। মূলত হাওরেই বেশি ফসল উৎপাদন হয়। গেল বছরের তুলনায় এবার বাম্পার ফলন হয়েছে।

কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের ৪ জেলার সকল হাওরের ধান কাটা-মাড়াই শতভাগ সম্পন্ন হয়ে গেছে। উঁচু জমির ধানও ৬০ ভাগ কাটা হয়েছে। তবে,হাওরের তুলনায় উঁচু জমির পরিমাণ একেবারেই কম। কয়েক দিনের মধ্যে উঁচু জমির ধানও পুরোপুরি কাটা হয়ে যাবে।

গেল বছরের চেয়ে এবার ফসল উৎপাদন সম্পর্কে তিনি জানান, গত বছর ঢলের পানিতে অনেক হাওরের ফসল তলিয়ে গিয়েছিল। উৎপাদনও কম হয়েছিল। এবছর লক্ষমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে চাষাবাদ করা হয়। আবহাওয়া পুরোপুরি অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এবার বেশি ধান উৎপাদন হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন