৩ মে ২০২৩
জনি শর্মা : আধ্যাতিক রাজধানী সিলেট। নগরবাসীকে নাগরিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার মূল কাজটি করে সিটি কর্পোরেশন। সিসিকের বর্তমান মেয়র ও বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর মূল বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় এবং আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী, যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায়। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘সিলেটী’ ইস্যুতে এখন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন এই দুই চৌধুরী। দুজনেই দুজনকে বহিরাগত বলে বাকযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সিলেট নগরবাসীর অনেকেই মনে করেন যে, নগরীর উন্নয়ন ও নাগরীর সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নগরীর স্থায়ী বাসিন্দা (কুট্টি) হলে ভালো হয়। কিন্তু বর্তমান মেয়র ও আসন্ন নির্বাচনে তার মূল প্রতিদ্বন্ধি দুজনের সিলেট নগরীর স্থায়ী বাসিন্দা (কুট্টি) নন। তারপরও তারা কে সিলেটী আর কে বহিরাগত তা নিয়ে জড়িয়ে পড়েছেন বাকযুদ্ধে। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগে ও প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এই ইস্যুতে জমে উঠেছে দুজনের কথার লড়াই। এনিয়ে নগরজুড়ে অলিতে গলিতে চায়ের দোকানগুলিতে চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ।
বিতর্কের শুরু হয় পহেলা মে । মহান মে দিবস উপলক্ষে নগরীর রেজিষ্ট্রারী মাঠে শ্রমিক দলের একাংশ কর্তৃক আয়োজিত সমাবেশে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নাম উল্লেখ না করে তাকে ‘বহিরাগত’ বলে বক্তব্য দেন। জবাবে রাতেই আরেক সভায় আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র আরিফুলকে ‘বহিরাগত’ উল্লেখ করে পাল্টা বক্তব্য দেন।

নগরের রেজিস্টারি মাঠে আয়োজিত মে দিবসের সভায় মেয়র আরিফ বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সিলেটকে এমন একটা অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সিলেটের মানুষের কাছে সিলেটের যেন কোনো মানুষ নেই। সিলেটে যেন কোনো নেতৃত্ব নেই। আমাদের সবক দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে এনে আমাদের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা তা পরিহার করি। সিলেটে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এ মাটির সন্তানেরাই যথেষ্ট। বাইরে থেকে কেউ এসে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দাস বানাতে পারবে না। আমরা কারও দাস বনতে (হতে) চাই না। আমাদের রক্তচক্ষুর ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না। যারা এই সিলেটের মাটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত, তাঁদের বাদ দিয়ে হায়ার (ভাড়া) করে কাউকে এনে বিভিন্ন এলাকার মানুষদের দিয়ে আমাদের নেতৃত্ব দেবেন, আমরা কি সবাই দাসখতে দস্তখত (দাসত্বের অঙ্গীকার) দিয়েছি? না, এটা হতে পারে না। সিলেটের মানুষ জেগে উঠেছে।’

একই দিন রাতে নগরীর ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ আয়োজিত এক সভায় মেয়র আরিফের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী, যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নাকি বলেন, আমি বাইরে থেকে এসেছি। আমার বাড়ি তো ১৭ কিলোমিটার দূরে। আমার জন্ম হয়েছে এই সিলেটেই। ওনার বাড়ি তো কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার জেলা)। তাহলে কে বহিরাগত? কমলগঞ্জ থেকে যদি তিনি সিলেটের মেয়র হতে পারেন, তাহলে আমি সিলেটে থেকে কেন সিলেটের মেয়র হতে পারব না?
তিনি বলেন, এই শহরে রাজনীতি করেছি। প্রবাসে গেলেও এই শহরের জন্য রাজনীতি করেছি। সংসদ নির্বাচন, সিটি নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্বাচনে আমি এই সিলেটে ছিলাম। এই সিলেটের মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য আমি কাজ করেছি, এটা কোনো বিষয় নয়। উনি ভয় পান কেন? ভয় পাওয়ার কারণ কী? উনি তো উন্নয়ন করেছেন। শুনেছি, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছেন! তো নির্বাচনে ভয় পান কেন?’
এদিকে, নির্বাচনে মেয়র পদে দলের যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে দলীয় মনোনয় চুড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্তের কারণে দলটির মনোনয়নে গত দুটি নির্বাচনে জয় পাওয়া আরিফুল হক চৌধুরী স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
মেয়র আরিফের ঘনিষ্ট সূত্রমতে, সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) আসন্ন নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী হতে বিএনপি ছাড়ছেন দলটির নির্বাহী সদস্য ও সিসিক’র বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। শুধু বিএনপি নয়, মেয়র পদ থেকেও পদত্যাগ করছেন তিনি। সিলেট রেজিস্ট্রি মাঠে ২০ মে তার উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশেই মেয়রপ্রার্থী হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বিএনপি ও মেয়রপদ ছাড়ার দিনক্ষণ জানাতে পারেন টানা দুইবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০ মে রেজিষ্ট্রারী মাঠে জনসভা করে এর পর দিন ২১ মে আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপি থেকে পদত্যাগ ও মেয়র পদ ছাড়ার কথা রয়েছে। ওই দু’টি পদ ছেড়ে ওইদিন অথবা পরেরদিন ২২ মে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে তা দাখিল করতে পারেন তিনি।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২১ জুন সিলেট সিটি করপোরেশনে ইভিএমে ভোট হবে। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ২৩ মে, বাছাই ২৫ মে ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১ জুন।