২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩


প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় বালি-পাথর উত্তোলন : ঝুঁকিতে জাফলং সেতু

শেয়ার করুন

গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি : প্রকৃতি কন্যা হিসাবে সারাদেশে এক নামে পরিচিত সিলেটের জাফলং। জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। জাফলং, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত, একটি পর্যটনস্থল। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত। সিলেটের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ছিল জাফলং সেতু নির্মাণ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেতুটি পূর্ণাঙ্গরূপ পেলেও মাত্র চার বছরের মাথায় ঝুঁকিতে পড়েছে। যেকোনো মুহূর্তে সেতুটির বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিন দেখা গেছ- সেতুর নিচ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালি ও পাথর উত্তোলনের ফলে দুটি বাদে সব পিলারের ভূগর্ভস্থ অংশের চারপাশ আলগা হয়ে পড়েছে। সেতুর ওপর হালকা যান চলাচলেও মাত্রাতিরিক্ত ঝাঁকুনির সৃষ্টি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রহস্যজনক কারণে পাথর ও বালি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। জাফলং, সিলেট শহর থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে বয়ে আসা পিয়াইন নদীর জাফলং খেয়াঘাট এলাকায় এলজিডির তত্ত্বাবধানে প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল জেলা সদরের সঙ্গে গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলংয়ের সড়ক যোগাযোগ সহজ ও দূরত্ব কমিয়ে আনা।

২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জাফলং সেতু প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৮ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে যানবাহন চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয় সেতুটি। ওইদিন সেতুটির ওপর যানবাহন যাতায়াত উদ্বোধন করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ এমপি।

স্থানীয়রা জানান, জাফলং সেতু উদ্বোধনের পর সিলেট সদর উপজেলার সঙ্গে জাফলংয়ের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি উত্তর সিলেটের জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট-কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার যোগাযোগ সহজতর হয়। যোগাযোগ ও পর্যটন সম্ভাবনার উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায়ও নতুন সম্ভাবনা দেখা দেয়।

এদিকে জাফলং পাথরকোয়ারি ইসিএভুক্ত এলাকা হওয়ায় বাকু পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয় সরকার। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীদের স্বার্থের কারণে জাফলং সেতুটি ঝুঁকিতে পড়েছে। উপজেলার সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় ব্যক্তির মদদে সেতুর নিচ থেকে বালি পাথর উত্তোলন করছে একটি চক্র। এতে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে সেতুটি।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় স্থানীয় এক ব্যক্তি সব পক্ষকে ম্যানেজ করে জাফলং সেতুর নিচ থেকে বালি ও পাথর উত্তোলনকারী চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এছাড়া জাফলং বল্লাঘাট পাথর উত্তোলন ও শ্রমিক বহুমুখী সমবায় সমিতির দু‌‌’একজনের নামও রয়েছে ওই চক্রের সঙ্গে। যদিও স্থানীয় ঐ ব্যক্তি গণমাধ্যম কর্মীেদরকে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

জাফলং নদী ঘুরে দেখা যায়, বোমা মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্র দিয়ে বালি ও পাথর উত্তোলন অব্যাহত রাখায় এরই মধ্যে সেতুটির দুটি পিলার ছাড়া সব পিলারের ভূগর্ভস্থ অংশ আলগা হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সেতু ওপর দিয়ে যেকোনো ধরনের হালকা যান চলাচল করলে বড় ধরনের ঝাঁকুনির সৃষ্টি হচ্ছে। তাই যেকোনো সময় সেতুটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছূক এক মুদি দোকানদার জানান, একটি চক্র গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে ইসিএভুক্ত এলাকা জাফলং, পিয়াইন ও ডাউকী নদীর উৎসমুখ হয়ে জাফলং সেতু পর্যন্ত অবাধে পাথর উত্তোলন করছে।

মৌলভীবাজার থেকে জাফলংয়ে আসা এক পর্যটক বলেন, যারা বালি পাথর উত্তোলন করছে, তারা সম্ভবত খুব প্রভাবশালী। প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সেতুটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।’ আরেকজন বলেন, ‘সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে উত্তর-পূর্ব সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলংবাসীকে সেই পুরনো খোয়া নৌকার যুগে ফিরে আসতে হবে। এখনই বালি-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেয়ার করুন