২৯ জানুয়ারি ২০২৩
আজকের সিলেট ডেস্ক : বহুল আলোচিত রামপাল এবং চট্টগ্রামের ৮টিসহ মোট ৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে রামপাল কয়লা সংকটে এবং গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে চট্টগ্রামে বন্ধ আছে ৬টি। আর দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে কাপ্তাই এবং টেকনাফ সোলার প্লান্ট দুটি।
দেশের একমাত্র কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে পানির স্বল্পতায় বন্ধ রয়েছে ৪টি ইউনিট। সচল ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৮১২ মেগাওয়াট। এ কারণে শীতের এই মৌসুমেও বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার ভোগান্তিতে আছে জনজীবন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিতরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামের রাউজানে ২১০ মেগাওয়াট করে ৪২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট পুরোপুরি সচল রাখতে প্রয়োজন ৪৫ মিলিয়ন করে ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
আবার শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে প্রয়োজন ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও শিকলবাহার ৬০ মেগাওয়াটের অপর বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজন ১৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। গ্যাস সংকটের কারণে এখন চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রই বন্ধ রয়েছে।
বন্ধ রয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ মেগাওয়াটের রিজেন্ট পাওয়ার প্লান্ট, ১০০ মেগাওয়াটের এনার্জি প্যাকও। পানির স্বল্পতায় দেশের একমাত্র কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে ৪টি ইউনিটই বন্ধ রয়েছে। শুধু একটি ইউনিট (২ নম্বর ইউনিট) থেকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
কাপ্তাই জল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এটিএম আবদুজ্জাহের বলেন, ‘কাপ্তাই লেকে পানি স্বল্পতায় ১, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কাপ্তাই লেকের পানির পরিমাণ ছিল ৮৫ দশমিক ৬৩ মিনস সিলেভ (এমএসএল)। লেকে রুল কার্ভ অনুযায়ী বর্তমানে পানি থাকার কথা ১০১ দশমিক ২১ মিনস লি লেভেল। ২ নম্বর ইউনিটের ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। বর্তমানে ইউনিটটি সংস্কার করে সচল করা হয়েছে। যেখান থেকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।’
তবে পিডিবি চট্টগ্রামের (দক্ষিণ অঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী (ডিস্ট্রিবিউশন) রেজাউল করিম বলেন, চট্টগ্রামে এখন কোনো লোডশেডিং নেই। সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে ৮১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদাও রয়েছে ৮১২ মেগাওয়াট। কয়লা সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ডলারের যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে সেটি এখন প্রভাবিত করছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে। এমন প্রেক্ষাপটে শীতকালেও রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে। শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কম থাকার পরেও যদি লোডশেডিং হয়, তাহলে গ্রীষ্মকালে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? সেটি ভেবে অনেকে উদ্বিগ্ন হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে আসতে পারে। তখন বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করছেন।
শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায় প্রায় অর্ধেক। কিন্তু, অল্প চাহিদার বিদ্যুৎও উৎপাদন করতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যার কারণে মাঘ মাসের শুরুতে খুলনায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে (ওজোপাডিকো)।
সূত্র মতে, অফপিক আওয়ারে খুলনায় ১৯ জানুয়ারি লোডশেডিং ছিল প্রায় ২৪ মেগাওয়াট আর পিক আওয়ারে লোডশেডিং ছিল ৪ মেগাওয়াট। পরদিন শুক্রবার সকালেও লোডশেডিং ছিল ৫ মেগাওয়াট। এতে বিদ্যুৎ ছিল না খুলনা নগরীর বিভিন্ন এলাকায়।
ওজোপাডিকো থেকে জানা গেছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ থাকায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হঠাৎ কমে যাচ্ছে।
জানা গেছে, কয়লার অভাবে ১৫ দিন ধরে (শনিবার পর্যন্ত) বন্ধ রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট, যেটির উৎপাদন ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নিয়মিত ৫৬০ থেকে ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ৪৬০ মেগাওয়াট ঢাকার জাতীয় গ্রিডে এবং ২০০ মেগাওয়াট খুলনাসহ ওজোপাডিকোতে সরবরাহ করা হচ্ছিল।
১৪ জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পদ্মার এপারের ২১টি জেলায়। ১৫ আগস্ট কেন্দ্রটিতে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করা হলেও ১৭ ডিসেম্বর থেকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। এর আগে গত ২৪ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর মাত্র ২৭ দিনের মাথায় ১৪ জানুয়ারি সকালে তা বন্ধ করে দেয়া হয়।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত উৎপাদনের জন্য কেন্দ্রটিতে প্রায় পাঁচ হাজার টন কয়লা লাগত। কয়লা আসত ইন্দোনেশিয়া থেকে। কিন্তু, ডলার সংকটে কয়লা আনা যাচ্ছে না। চলতি বছরের জুনে এ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কয়লা সংকটে তাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লি. (বিআইএফপিসিএল)-এর উপমহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার না দেয়ায় কয়লা আমদানি করা যায়নি। ইন্দোনেশিয়ায় কয়লাবোঝাই একটি জাহাজ প্রস্তুত আছে। ঋণপত্র পেলে জাহাজটি বাংলাদেশের পথে রওনা হবে। আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুত এই সংকট নিরসনের।
সংকট কতটা গভীর?
রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে দুটি ইউনিটের মধ্যে একটি ইউনিট অর্থাৎ ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছিল। আরেকটি ইউনিটের নির্মাণ কাজ এখনও চলছে। এখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ঢাকা এবং খুলনায়। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসার এক মাসের কম সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেল।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আকরাম উল্লাহ বলেন, ডলারের সংকটের জন্য কয়লা আনা যাচ্ছিল না। যার কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ডলারের সংকট থাকায় কয়লার দাম পরিশোধ করা যাচ্ছিল না। ফলে কয়লা আনতে ‘ঝামেলা হচ্ছিল’।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ডলার সংকটের কারণ লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খোলা নিয়ে জটিলতা হওয়ার কারণে কয়লা আনা বিঘ্নিত হয়েছিল এবং এটি আসতে দেরি করেছে।
যে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর সেখানে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের জন্য রামপালে কয়লা আনা হয়েছিল। সেটি দিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা হয়। তবে ডলার সংকট কেন হয়েছিল সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে প্রথম সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয় ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। সেখানে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালনের একটি প্রস্তাবনা ছিল। এর ভিত্তিতে ২০১২ সালে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের, বাগেরহাট জেলার রামপালে দুটি ৬৬০ ইউনিট মিলে মোট ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর সঙ্গে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) এই চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এরপর থেকেই শুরু হয় জমি অধিগ্রহণের কাজ। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) ওপর। প্রকল্প বাবদ খরচ ধরা হয় ১৬ হাজার কোটি টাকা।