২৮ ডিসেম্বর ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : অবশেষে কাঙ্ক্ষিত প্রতীক্ষার অবসান হতে চলল। স্বপ্ন এখন আর অধরা নয়। রাজধানীবাসীর হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় মেট্রোরেল। আজ ঢাকার উড়াল রেললাইন দিয়ে হর্ণ বাজিয়ে ছটেছে সমৃদ্ধ তথ্যপ্রযুক্তির যন্ত্রবাহন মেট্রোরেল। যা এতদিন উন্নত কোনো দেশের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল।
দেশের মানুষ উন্নত দেশ ঘুরে এসে উড়ালপথে রেলে চলার ভ্রমণকাহিনী শোনাতো। আর এখন? এখন তা দেশের মানুষের কাছে এক অকল্পনীয় বাস্তবতা। যা সকালের জ্বলজ্বলে রোদ কিংবা প্রাকপ্রভাতের রক্তিম সূর্যের মতো বাস্তব, যা স্পর্শ করলেই অস্তিত্ব এসে সামনে হাজির। সাধ আর সাধ্যের রসায়নে একাকার হয়ে বিরামহীন ছুটে চলবে দীর্ঘ বছরের লালিত রঙিন স্বপ্ন-সাধ মেট্রোরেল।
বুধবার মেট্রোরেল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যানজট ছাড়া উড়াল পথ দিয়ে সাঁ-সাঁ করে যাত্রী নিয়ে ছুটবে মেট্রোরেল। ছুটে চলবে আগারগাঁও থেকে উত্তরা। ফিরতি যাত্রা উত্তরা-আগারগাঁও। আগামী ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই পথের মাঝে বিরতিহীনভাবে চলবে মেট্রোরেল।
আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা মহিউদ্দিন হাওলাদার বলছিলেন ‘এতদিন ধরে মেট্রোরেল নির্মাণকাজ চলমান থাকা সংকুচিত সড়ক দিয়ে ঘন যানজট লেগেছিল। তবে সেই কষ্টের অবসান হতে চলছে। এখনও যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। আমাদের মতো দেশেও চলবে মেট্রোরেল। ভাবিনি কোনোদিন!’
এদিকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে উড়াল সড়ক একসময় চমক এনেছিল মানুষের মধ্যে। বদলে যাওয়া শুরু করে ঢাকার রূপ। এরপর পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী যুগে পা রাখে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের এ সোনালি পাখায় এবার যুক্ত হলো আরও একটি স্বর্ণ-পালক। যুগান্তকারী যুগ টপকে ঘটলো নতুন ইতিহাসের সোনালি সূচনা। সময়ের শরীরে খোদাই হয়ে রইলো এ ইতিহাস, এই যুগান্তকারী জয়।
আজ উদ্বোধন হলেও সাধারণ যাত্রীদের জন্য মেট্রোরেলের দুয়ার খুলবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে। মেট্রোরেল উদ্বোধনের মাধ্যমে নবযুগের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে দেশের পরিবহন সেক্টরে। মেট্রোরেল ঘিরে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ নাগরিকরা খুশি। তাদের কৌতূহলের অন্ত নেই।
মেট্রোরেল নিয়ে কৌতূহলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনন্যা রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সাধারণ যাত্রীদের নিয়ে যেদিন মেট্রোরেল চলাচল করবে, ওই দিনই আমরা মেট্রোরেলে চড়বো সব বন্ধুরা মিলে। এটি যাতায়াত মাধ্যম হলেও দেশে এর আগে মেট্রোরেল না থাকায় এই মুহুর্তে বিনোদন বা ভ্রমণ হিসেবেই এনজয় করব আমরা।’
জানা গেছে, আপাতত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা চলবে মেট্রোরেল। ১০ মিনিট অন্তর প্রতি যাত্রায় ২০০ জন করে যাত্রী বহন করবে একেকটি ট্রেন। এছাড়া বন্ধ থাকবে প্রতি মঙ্গলবার। যাত্রীদের দুই প্রান্তের দুই রেল স্টেশনে নিয়ে আসবে বিআরটিসির ৩০টি দ্বিতল বাস। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল ২০টি এবং উত্তরা হাউজ বিল্ডিং থেকে দিয়াবাড়ি স্টেশন পর্যন্ত ১০টি বাস চলবে। বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগর পরিবহনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যে ভাড়ার হার নির্ধারণ করে দিয়েছে, বিআরটিসির বাসে সেই ভাড়াই নেওয়া হবে।
এদিকে উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী যখন উত্তরা স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে চড়ে আগারগাঁও আসবেন ঠিক সেই সময় মেট্রোরেলের নিচের সড়কও বন্ধ থাকবে। প্রধানমন্ত্রী উত্তরা থেকে এসে আগারগাঁও স্টেশন ত্যাগ না করা পর্যন্ত মেট্রোরেলের নিচের সড়কে চলাচল বন্ধ থাকবে। এমনই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) থেকে। ডিএমপি অপারেশন্স শাখার যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এছাড়া ডিএমপির পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেওয়া হয়েছে সাত নির্দেশনা। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের আশপাশে সুউচ্চ ভবনগুলোতে ২৮ ডিসেম্বর সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ছাদে ওঠা যাবে না। বেলকনিতে থাকা যাবে না। ছাদে কোনো কাপড় শুকাতেও দেওয়া যাবে না। ছাদে কেউ অবস্থান করতে পারবেন না। এদিন সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো অফিস, দোকান বা রেস্টুরেন্ট খোলা রাখা যাবে না। এমনকি এসব এলাকায় ২৯ ডিসেম্বরের আগে নতুন কোনো ভাড়াটিয়াও ওঠানো যাবে না।
এলাকাগুলোর ভবন, বিল্ডিং ফ্ল্যাট, রেস্টুরেন্ট, হোটেল ও কমার্শিয়াল স্পেসে ২৮ ডিসেম্বর কোনো লোক থাকবে না। এমনকি মেট্রোরেলের দুপাশের সব ব্যাংকের এটিএম বুথ সকাল থেকে অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগারগাঁও স্টেশন ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের পাশে কোনো ছবি কিংবা ফেস্টুন লাগানো যাবে না। মেট্রোরেলের আশপাশের ভবন বিল্ডিং কিংবা ফ্ল্যাটে কারও কাছে বৈধ অস্ত্র থাকলে তা থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
মেট্রোরেলে থাকছে না কাগজের টিকিট। স্টেশন থেকেই কার্ড কিনে যাতায়াত করতে হবে। প্রথম দিকে দুই ধরনের কার্ড পাওয়া যাবে। স্থায়ী ও এক যাত্রার (সিঙ্গেল জার্নি) কার্ড। শুরুতে উত্তরা ও আগারগাঁও স্টেশন থেকে কার্ড সংগ্রহ করা যাবে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ভাড়া ৬০ টাকা। ১০ বছর মেয়াদি স্থায়ী কার্ড কিনতে লাগবে ২০০ টাকা। এই কার্ড দিয়ে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনমতো টাকা রিচার্জ করা যাবে। তবে স্থায়ী কার্ড পেতে আগে থেকে নিবন্ধন করতে হবে। বৃহস্পতিবার ডিএমটিসিএলের ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের লিংক দেওয়া হবে। এদিন থেকে করা যাবে নিবন্ধন। নিবন্ধন করতে নিজের নাম, মাতা-পিতার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা পাসপোর্ট নম্বর, মুঠোফোন নম্বর ও মেইল আইডি লাগবে। স্টেশনের টিকিট অফিস মেশিন (টিওএম) থেকে বিক্রয়কর্মীর সহায়তায় কেনা যাবে কার্ড। এছাড়া ভেন্ডিং মেশিন থেকে যাত্রী নিজেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
এক যাত্রার (সিঙ্গেল জার্নি) কার্ডের জন্য নিবন্ধনের প্রয়োজন হবে না। স্টেশন থেকে এই কার্ড কিনে যাত্রা করা যাবে। ট্রেন থেকে নামার সময় কার্ড রেখে দেওয়া হবে। সিঙ্গেল রাইডের কার্ডে নির্ধারণ থাকবে সময়। এরপর এই কার্ড আর কার্যকর থাকবে না। তবে যারা এটিএম কার্ড নিয়মিত ব্যবহার করেন, তাদের জন্য মেট্রোরেলের সেবা নেওয়া সহজ হবে। কারণ মেট্রোরেলের টিকিট, কার্ড ও টাকা জমা দেওয়ার পদ্ধতি একই ধরনের।
মেট্রোরেলে প্রতিটি ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য একটি করে কোচ বরাদ্দ থাকবে। ওই কোচে সর্বোচ্চ ৩৯০ জন নারী একই সময়ে যাতায়াত করতে পারবেন। পাশাপাশি অন্য কোচেও যাতায়াত করতে পারবেন নারীরা। অন্তঃসত্ত্বা ও জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য মেট্রোরেলের কোচের আসন সংরক্ষিত থাকবে। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য মেট্রোর সব সেবায়ই রাখা হয়েছে বিশেষ সুবিধা।
আপাতত ছয় কোচবিশিষ্ট ২৪ সেট চালু থাকবে। তবে ভবিষ্যতে আট কোচে উন্নীত করা যাবে। মাঝের চারটি কোচের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৩৯০ জন, ট্রেইলর কোচের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৩৭৪ জন যাত্রী পরিবহন করা যাবে। ছয় কোচবিশিষ্ট মেট্রোরেলে মোট আসন সংখ্যা ৩০৬টি। মাঝের চারটি কোচের প্রতিটিতে আসন সংখ্যা ৫৪টি, ট্রেইলর কোচের প্রতিটিতে আসন সংখ্যা ৪৫টি।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত মেট্রোরেল প্রকল্পে কর্মরত সাতজন জাপানি নাগরিকের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে। এমআরটি লাইন-৬ এর উত্তরা ডিপো এলাকায় মেট্রোরেল এক্সিবিশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টারে এই স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়। নিহত সাত জাপানি প্রকৌশলী হলেন- তানাকা হিরোশি, ওগাসাওয়ারা, শাকাই ইউকু, কুরুসাকি নুবুহিরি, ওকামুরা মাকাতো, শিমুধুইরা রুই ও হাশিমাতো হিদেইকো।