২৫ ডিসেম্বর ২০২২


হাওরে পানির অভাবে কৃষকের হাহাকার

শেয়ার করুন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : চলতি বছর দফায় দফায় ভয়াবহ বন্যায় তলিয়ে যায় সুনামগঞ্জ জেলা। পানিতে ভরপুর ছিল নদ-নদী ও হাওরগুলো। অথচ চলতি শুষ্ক মৌসুমে জেলার বৃহত্তর ‘দেখার হাওর’ পানির অভাবে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধানের খেত শুকিয়ে চৌচির হয়ে গিয়েছে। হাওরে এবারও বোরো আবাদ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে দেখা গিয়ে দেখা যায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরের একজন কৃষক আব্দুল মুকিত গেল বন্যার পানিতে যখন ঘরবাড়ি, ঘরে থাকা ধান সব হারিয়ে যখন নিঃস্ব ছিলেন এবার তাই শেষ সম্ভলটুকু জমিতে ফসল চাষাবাদ করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সে স্বপ্নে আবারও বাধ সাধলো পানিই। তবে এবার পানির অভাবেই হচ্ছে না জমিতে চাষাবাদ।

বছরে এ মৌসুমটাতে বোরো চাষাবাদে ব্যাস্ত থাকেন কৃষক আব্দুল মুকিতসহ হাওরের কৃষকরা। কিন্তু এবার হাওরে পানি সংকটে জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না। প্রতিদিন এভাবে জমির পাশে এসে অসহায়ের মতো পানির অপেক্ষায় থাকেন।

কৃষক আব্দুল মুকিত বলেন, ‘বন্যায় সবতা পানিতে ভাইসা গেছে ভাবছিলাম ইবার ধান কইরা হয়তো সারাটা বছর পরিবার লইয়া একটু গোছাইতাম পারমু। কিন্তু এই পানিই আবার আমরার সব নিলো,পানির অভাবে আর ধান লাগাইতা পারতামনা। সারাবছর কেমনে খাইমু’।

একই অবস্থা সুনামগঞ্জ জেলা সদর, শান্তিগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত দেখার হাওর। অন্যান্য বছর এ সময়ে হাওরগুলোয় পানিতে টইটম্বুর থাকে। জমিতে এ সময় হাঁটুপানি থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে পুরো দেখার হাওরের বোরো আবাদের জমি শুকিয়ে ফাটল ধরেছে।

এর মূল কারণ দেখার হাওরের জলমহাল বড়দই বিল, কাস্টগঙ্গা বিলসহ কয়েকটি জলমহালের ইজারাদাররা বিলগুলোয় বেশি মাছ ও লাভের আশায় নভেম্বর থেকে বাঁধগুলো কেটে দিয়ে পানি ছেড়ে দেন। এতে করে হাওরের পানি ধীরে ধীরে নেমে শুকিয়ে গিয়েছে। ফলে পানি সংকটে জমিতে চাষাবাদ হবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কায় হাওরের কৃষক।

একই হাওরের কৃষক ফেদাউর রহমান বলেন, পুরো হাওরে এক ফুটা পানি নাই। পানি ছাড়া জমিতে চাষাবাদ অসম্ভব। এই হাওরের হাজার হাজার কৃষক এবার না খেয়ে মরবে’

ভবানী পুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মোশাহিদ আলী বলেন, এই দেখার হাওরের ফসলে পুরো ৪ উপজেলার কৃষকদের সারা বছরের খোরাক হয়। কিন্তু এবার ফসল করতে না পারায় বিপাকে পড়বে এসবা কৃষকরা। তাই প্রশাসন যদি কোনো সেচ ব্যবস্থা না করে পানি সরবরাহ করতে না পারে। তাহলে জেলায় ব্যপক খাদ্য সংকট পড়তে পারে।

হাওর পারের কৃষকরা জানান, নভেম্বরেই জলমহাল ইজারাদাররা তাদের স্বার্থে হাওরের বাঁধ কেটে পানি ছেড়ে দিয়েছেন। এতে করে বোরো চাষের জমি পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। শুধু দেখার হাওর নয়, জেলার অন্যান্য হাওরগুলোর পানিও দ্রুত নেমেছে। এতে বোরো চাষাবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে হাওরের কৃষকের মাঝে। তাই বোরো ধানের খেত বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলার কৃষকরা।

তবে সুনামগঞ্জ বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী কাজী হোসনে আর রাফি জানান, বরাদ্দ না থাকার কারণে এ বছর পানির ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। তবে আগামী বছর যদি কেউ আগাম আবেদন করেন। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সেচের ব্যবস্থা করা হবে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভাগ বলছে, হাওর অধ্যুষিত জেলার ১২ উপজেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি রয়েছে। এর মধ্যে এবার বোরো মৌসুমে ২ লাখ ২২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বোরো মৌসুমে ২ লাখ ২২ হাজার ৬৯৫ হেক্টর বোরো ধান আবাদ হয়। গতবারের চেয়ে এবার ৩৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ কম হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, কৃষকরা জানিয়েছেন, পানি গেল বছরের চেয়ে তিন চার দিন আগে এবার নামতে শুরু করেছে। তবে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমেও সেচের ব্যবস্থা করা হবে। আশা করছি চাষাবাদ বিঘ্নিত হবে না।

শেয়ার করুন