১৪ ডিসেম্বর ২০২২
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : প্রকৃতিতে এখন চলছে হেমন্তকাল। মাঠে মাঠে পাকা ধান। কৃষকেরা নতুন ধান কেটে ঘরে তুলতে ব্যস্ত। কৃষাণীরাও উঠানে নতুন ধান মাড়াইয়ে একযোগে কাজ করছেন। চারিদিকে এখন নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধ। এই গন্ধই জানান দিচ্ছে ঘরে ঘরে নবান্নের উৎসব। এখন প্রতি বাড়িতে পিঠা পায়েশের ধুম। আত্মীয় স্বজনেরা নতুন পিঠাপুলি দিয়ে আপ্যায়ন করবেন অতিথিদের। আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠাবে মজার মজার পিঠাপুলি।
এসময় বাঙালি মায়েরা মেয়ে-জামাই বাড়িতেও পাঠাবেন হরেক পিঠা। এটিও যেন পার্বনের একটি অংশ। দাওয়াত করে জামাইকে আনা হবে। এসময় নতুন ধানের পায়েস যেন অমৃত। মূলত এই অগ্রহায়ণেই কৃষিজীবী মানুষ ঘরে প্রথম ধান তোলার পর সেই নতুন চালের তৈরি পিঠা-পুলি-পায়েস-মিষ্টান্ন সহযোগে উৎসবটি পালন করে। পাঠানো হয় মেয়ের বাড়িতে।
নবান্ন উৎসবে মেয়ের বাড়িতে নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠাপুলি পাঠানো বাঙালির চিরায়ত প্রথা। তাই এখনও গ্রামীণ জনপদের প্রতিটি বাড়িতে পিঠা তৈরি হয়। আর এমন চিত্র দেখা যায়, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে।
কার্তিকে ক্ষেতের ধান সবুজাভ থেকে সোনালী আভায় রুপান্তরিত হয়। অগ্রাহায়ণে এসে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। কৃষকেরা সেই সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। কখন নতুন ধান কাটার ধুম পড়বে। তখনই কৃষকের মুখে হাসি আর গৃহিণীদের পিঠা পায়েশ তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামীণ জনপদে। বাড়িতে বাড়িতে নতুন ধানের পিঠা তৈরির গন্ধে মুখরিত থাকে গ্রামাঞ্চল।
মেয়ের বাড়িতে পাঠানো হবে পিঠা-পুলি। আর এই আয়োজনে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই খুশির জোয়ার চলছে জানিয়ে সদর উপজেলার গিয়াসনগর ইউনিয়নের কৃষক আমির হোসেন বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে এখন উৎসবের আমেজ। অগ্রহায়ণে বাংলার শস্য ক্ষেতগুলো পাকা সোনালী আমন ধানে ভরে উঠে। আমরা এই ধান মাড়াই করে গোলায় তুলছি। নতুন ধানের চাল গুড়ো দিয়ে ঘরে ঘরে হরেক পিঠা-পুলির আয়োজনও চলছে।’
তিনবছর হলো ছোট মেয়েকে শহরে বিয়ে দিয়েছেন কাওয়াদীঘি এলাকার কাদিপুর গ্রামের রাইমনি সরকার বলেন, ‘দুদিন ধরে মেয়ের বাড়িতে পাঠানো জন্য নতুন চালের চার রখমের পিঠা, পুলি, নারিকেলের সন্দেশ ও গুড়ের মিষ্টান্ন তৈরি করছি।’
শহরের সৈয়ারপুর এলাকার শারমীন আক্তারের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর হলো। এখনও অগ্রাহায়ণ মাস এলেই বাবার বাড়ি থেকে নতুন ধানের পিঠা আসে।
তিনি বলেন, ‘মায়ের বয়স হয়েছে, তারপরও নিজের হাতে তৈরি পিঠা তিনি এখনো পাঠান। এবছর আমি সন্তানদের নিয়ে গ্রামে গিয়েছি। এই সময়টা আসলেই অনেক ভালো লাগে, যারা গ্রামে এই সময়ে যায় তারাই শুধু বুঝবে এর আনন্দটা কি।’
দুই বছর হলো বিয়ে করেছেন সাংস্কৃতিক কর্মী আব্দুর রব। থাকেন শহরের চাঁদনীঘাট এলাকায়। তিনি বলেন, ‘নবান্ন আমাদের জীবনের উৎসব যা আমাদের শিকড়কে মনে করিয়ে দেয়। আমি শহরে থাকলেও গ্রামের বাড়িতে মা চাচিরা থাকেন। তারা নতুন ধানের পিঠা তৈরি করেন। তারপরও শশুরবাড়ি থেকে পিঠা পুলি আসে।’
রাজনগর উপজেলার মেদিনিমহল গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব আছকির মিয়া বলেন, ‘মেয়ের বাড়িতে নতুন ধানের পিঠাপুলি পাঠানো আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। এটি বাঙালির চিরায়ত প্রথা। আমার তিন মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছি শহরে। তারাও তাদের মেয়ে বিয়ে দিয়েছে। এখনো আমি পিঠাপুলি তাদের পাঠাই, তারাও অপেক্ষায় থাকে।’
এখনো গ্রামে বাড়িতে নতুন ধান উঠলে আয়োজন করা হয় পিঠা উৎসবের। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে সারা শীতকাল অবধি। তবে যে কোনো উৎসবে এখনো গ্রামাঞ্চলে পিঠা তৈরি হয় জানিয়ে শিক্ষক জাহাঙ্গীর জয়েস বলেন, ‘শীত মানেই পিঠা পুলি। আমরা শহুরে জীবনযাপনে যতই ব্যস্ত থাকি না কেন, ফেলে আসা দিনের পিঠা পুলির মজা আর তার সাথে মিশে থাকা অনুভূতিগুলো এখনো নাড়া দেয় আমাদের।’