১২ ডিসেম্বর ২০২২
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : কমলগঞ্জের শমশেরনগরে প্রশাসনের নাকের ডগায় শহীদ মিনার ও মুক্তিযোদ্ধা সরণি চত্বর দখল করেগড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ সিএনজি চালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড।শহীদ মিনার চত্বরে গড়ে তোলা সিএনজি অটোস্ট্যান্ডের ফাঁকে গড়ে উঠেছে প্রস্রাবখানা।পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা সরণি ও মূল বেদিতে ফেলা হচ্ছে সিগারেটের উচ্ছিষ্ট অংশ ও ময়লা-আবর্জনা। চারপাশে নোংরা পরিবেশ। জুতা পায়ে মূল বেদির ওপর বসে আড্ডা দেয় পরিবহনের চালকরা।এতে শহীদ মিনার অপবিত্র করা ছাড়াও এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতন মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভের সঞ্চার হলেও এ ব্যাপারে নিরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন।
জানা গেছে, বিমানবন্দর সড়কে ৪৮ বছর আগে নির্মাণ করা হয় শহীদ মিনার ও মুক্তিযোদ্ধা চত্বর।২০০০ সালে শমসেরনগর এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার ফলক বসানো হয় মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে। এটি শমসেরনগর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে পরিচিত। ২০২১ সালে পুরনো শহীদ মিনারটির পাশে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের অর্থায়নে আরেকটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। দৃষ্টি নন্দন শহীদ মিনারটি বর্তমানে অবহেলার শিকার। জাতীয় দিবসগুলোতে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়ে থাকে। জাতীর গুরুত্বপূর্ণ এসব দিবসের দুয়েকদিন আগে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হলেও বাকি দিনগুলোতে অযত্নে-অবহেলায় পড়ে থাকে। ফলে শহীদ মিনার এলাকার সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে।
শমসেরনগর বিমানবন্দর সড়কে শহীদ মিনার ঘুরে দেখা গেছে, শহীদ মিনারের দেয়াল ভেঙে এর পাদদেশে যত্রতত্র সিএনজি অটোরিকশা রাখা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিরক্ষায় নির্মিত সৌধের দেয়াল ঘেঁষে সিএনজি অটোরিকশার লাইন গ্রুপের টিন শেডের কার্যালয় থেকে মাইক দিয়ে গাড়ির নম্বর ডেকে সিরিয়াল দেয়া হচ্ছে। শহীদ মিনারে উঠে বা এর পেছনে গিয়ে ধূমপান করেন চালকরা।
কথা হয় সেখানকার এক চালকের সঙ্গে। একজন চালক জানান, স্ট্যান্ড না থাকায় শহীদ মিনার চত্বরে গাড়ি রাখা হয়। তবে আমাদের দ্বারা শহীদ মিনারের কোনো অমর্যাদা হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চালক জানালেন, তার গ্রুপের নেতা রাখতে বলছেন, তাই এখানেই অটোরিকশা রাখা হয়। এছাড়া কেউ তো কোনোদিন বাধাও দেয়নি। যেদিন এই জায়গায় ফুল দিতে আসে তখন আমরা গাড়ি রাখি না।
স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী জানান, প্রায়ই পরিবহনের চালক, শ্রমিক ও যাত্রীদের জুতা পায়ে শহীদ বেদিতে বসে বিড়ি-সিগারেট ফুঁকতে দেখা যায়। এতে শহীদ মিনারের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। সেইসঙ্গে অযত্ন-অবহেলার কারণে শমসেরনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা ছিল তাও একেবারে মুছে যাচ্ছে।
শমসেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মছব্বির বলেন, শহীদ মিনার ও মুক্তিযোদ্ধা চত্বরটি যেভাবে মর্যাদাহীন হচ্ছে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কিছুই হতে পারে না। দেশে যত আন্দোলন হয়েছে, সবকিছুর সূতিকাগার হলো ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মরণেই এ শহীদ মিনার। এর মর্যাদা রক্ষা করা না হলে স্বাধীনতাযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও ভাষা আন্দোলনের শহীদদের অপমান করা হয়।
তিনি আরো বলেন, সিএনজি চালকরা কথা বললে শুনে না। তাই এই শহীদ মিনারটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড সরানোর জন্য প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান তিনি।
শমসেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুয়েল আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শহীদ মিনার চত্বরে দেয়াল ভেঙে সিএনজি চালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। আমরা ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে স্ট্যান্ড সরানোর জন্য বলেছি। যদি তারা স্ট্যান্ড না সরায় তাহলে শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষায় আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৫ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নিয়ে হাইকোর্টে করা এক রিটের শুনানির রায়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনারের ভাবগাম্ভীর্য, মর্যাদা রক্ষার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়।