১০ নভেম্বর ২০২২


শহিদ নূর হোসেন দিবস ও গণতন্ত্রের প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : আজ ১০ নভেম্বর, শহিদ নূর হোসেন দিবস। ১৯৮৭ সালের এই দিনে তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। সেইদিন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহিদ হয়েছিলেন সাহসী ও তেজোদীপ্ত এই যুবক। তাঁর এই আত্মত্যাগই স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছিল। ফলে দুর্বার আন্দোলনে স্বৈরাচারের মসনদ ভেসে যায়। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে নূর হোসেন অবিস্মরণীয় এক নাম। এজন্য প্রতিবছর নূর হোসেনের শহিদ হওয়ার দিন অর্থাৎ ১০ নভেম্বর ‘শহিদ নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, পাকিস্তান থেকে লাল সবুজের এই দেশ স্বাধীন হলেও বিভিন্ন সময়ে দেশে স্বৈরশাসকরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে অগণতান্ত্রিক শাসন চালিয়েছে। এমনই এক স্বৈরশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ১৯৮২ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এই স্বৈরশাসক। পরবর্তীতে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে ১৯৮৭ সালে প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জয় লাভ করেন তিনি। তবে তার এ নির্বাচনকে জালিয়াতি অ্যাখ্যা দিয়ে ফের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দাবি করে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। শুধু নারাজ ছিলেন স্বৈরাচার এরশাদ। ফলে দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এক হয়ে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করেন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ছিল অবরোধের দিন। কিন্তু তার আগের দিন থেকেই ঢাকার সঙ্গে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে কার্যত ঢাকাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল স্বৈরশাসক। জারি করা হয়েছিল ১৪৪ ধারাও। আর এসব দেখে নূর হোসেন তাঁর মতোকরে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত নেন।

পরে ওইদিন ঢাকার এক অবরোধ কর্মসূচির মিছিলে নূর হোসেন যোগ দেন। তার অংশগ্রহণ অন্য আর দশজনের থেকে ভিন্ন ছিল। প্রতিবাদী এই যুবকের বুকে-পিঠে সাদা রঙে লেখা ছিল-‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। তাঁর প্রতিবাদ সেইদিন সবার নজর কেড়েছিল। ২৫ বছরের টগবগে যুবকের বুকে-পিঠে ধারণ করা জ্বলন্ত সেই স্লোগান নিয়ে ছুটছিলেন মিছিলের অগ্রভাগে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জীবন্ত সেই পোস্টার পৃথিবীর সব পোস্টারকে হার মানিয়েছিল।

কিন্তু যুবলীগ কর্মী নূর হোসেনের জীবন্ত পোস্টার রাাজপথে এভাবে বয়ে বেড়ানো মেনে নিতে পারেনি স্বৈরশাসকের পেটোয়া বাহিনী । সেইদিনের মিছিলটি ঢাকা জিপিওর সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলে স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশের গুলিতে নূর হোসেনসহ তিনজন আন্দোলনকারী শহিদ হন। এ সময় বহু আন্দোলনকারী আহত হন। শহিদ অপর দুইজন হলেন যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা বাবুল এবং কৃষক নেতা আমিনুল হুদা টিটু। পরবর্তীতে নূর হোসেনের এই আত্মত্যাগ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। ফলে অব্যাহত লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটে।

এদিকে এবারের নূর হোসেন দিবসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহিদ নূর হোসেনসহ সব শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সবাইকে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। শহিদ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষ্যে ৯ নভেম্বর, বুধবার দেয়া এক বাণীতে তিনি এ আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১০ নভেম্বর এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৮৭ সালের এই দিনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের সাহসী সৈনিক নূর হোসেন ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এই স্লোগান শরীরে ধারণ করে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। সেদিন প্রতিবাদের পুরোভাগে থাকা শহিদ নূর হোসেনের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। এ সময় শহিদ নূর হোসেন দিবসে নূর হোসেনসহ গণতন্ত্রের জন্য আত্মোৎসর্গকারী সকল শহিদকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন আবদুল হামিদ।

নূর হোসেন দিবসে বাণী দিয়েছেন জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। ৯ নভেম্বর, বুধবার দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে ১০ নভেম্বর একটি অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৮৭ সালের সেইদিনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এ আন্দোলন-সংগ্রামে নূর হোসেনসহ অনেকে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। ফলে অব্যাহত লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসকের পতনের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়। জনগণ ফিরে পায় ভোট ও ভাতের অধিকার। তিনি নূর হোসেনসহ সব শহিদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

নূর হোসেন দিবস নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নায়ক শহিদ নূর হোসেনের আপন ভাই আলী হোসেন বিবার্তাকে বলেন, নূর হোসেন দিবসে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি তাদেরকে, যারা আত্মাহুতি দিয়েছে গণতন্ত্রের জন্য। শুধু আমার ভাই নূর হোসেন না,বহু লোক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন। তবে এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি গণতন্ত্র শুরু হয় নাই। এক্ষেত্রে আমি বলব, গণতন্ত্রের জন্য সহযোগিতা দরকার। যেভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে তখন সব দল মিলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনটা করেছিল। আরেকটা বিষয়, এদেশকে জেনেশুনে স্বাধীন করা হয়েছে। কাজেই স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিরা যদি আগের মতো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে তো দেশ স্বাধীন করে আর লাভ হলো না।

তিনি বলেন, এদেশের জন্য শুধু আমার ভাই না! দেশের ভালোর জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, ভাষা আন্দোলনের জন্য, স্বাধীনতার জন্য অনেকে আত্মাহুতি দিয়েছে। এগুলো কি বিফলে যাবে? এ বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে। আর বুঝে দেশটাকে ভালোবেসে এগিয়ে নিতে হবে। আরেকটা বিষয় বলতে হয়, ছাড়ের মনোভাব নিয়ে আমাদের দেশটাকে চালাতে হবে। কারণ সবাই যদি যার যার জায়গা থেকে কঠিন অবস্থায় থাকে, তাহলে দেশ আগাবে কীভাবে? এক সরকার যাবে, আরেক সরকার আসবে। এটা তো অবশ্যই হবে। কিন্তু সবার উপরে দেশটাকে সুন্দর রাখতে হবে। আর এটা হলে আমার ভাই নূর হোসেনের আত্মা শান্তি পাবে।

তিনি আরো বলেন, যারা গরীব মানুষ অর্থাৎ দিন আনে দিন খায় তারা যেন মাথা গোঁজার ঠাঁই পাই, যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারে, সেই বিষয়টি দেখা উচিত। গণতন্ত্র মানে রাজনৈতিক চর্চার সাথে শুধু মারামারি, কাটাকাটি না। গণতন্ত্র হলো দেশের মানুষ ভালো থাকবে কিভাবে সেটাই। আর সেই আশায়ই তো আত্মাহুতি দিয়েছে নূর হোসেনসহ শহিদরা।

গণমাধ্যমের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে আলী হোসেন বলেন, যারা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে শহিদ হয়েছে তাদের সবারই পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়া উচিত। শুধু আমার পরিবার না, সবাইকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে তাদের পরিস্থিতি জিজ্ঞেস করা উচিত। তারা কেমন আছে? কিভাবে আছে? এই ব্যাপারে আপনাদের সাংবাদিকদেরও জোরালো ভূমিকা রাখা উচিত। এটা আপনাদেরই দায়িত্ব। পরিবারের কর্মক্ষম সন্তানকে হয়তো অনেকে হারিয়েছে, তারা কিভাবে চলে? কেউ তো খবর নিচ্ছে না। একটা-দুইটা লোক তো আর জীবন দেয় নাই। এরশাদ বিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অনেক লোকই শহিদ হয়েছে। তাই শুধু নূর হোসেনের পরিবার না, সকল পরিবারের খোঁজ নেওয়া উচিত।

দাবি জানিয়ে শহিদ নূর হোসেনের ভাই বলেন, নূর হোসেনসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মহুতি দেওয়া সকলকে স্বীকৃতি দিলে ভালো হবে। সকল আন্দোলনের শহিদদের নামগুলো এক জায়গায় লিখে রাখা হোক। তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম এ বিষয়ে জানতে পারবে। এতোগুলো লোক মারা গেছে। আর এ বিষয়গুলো অগোছালো হয়ে আছে। একটা স্তম্ভ করে তাদের নামগুলো লিখে রেখে তাদেরকে সম্মাননা করা যেতে পারে।

নূর হোসেন দিবস নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ এর মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর দেশে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে জীবন্ত এক পোস্টার বুকে-পিঠে নিয়ে অর্থাৎ ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগান নিয়ে বিক্ষোভে শামিল হওয়া এক যুবকের নাম নূর হোসেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে সেইদিনই প্রাণ হারান সাহসী এই যুবক।

তিনি বলেন, যে জন্য নূর হোসেন শাহাদাত বরণ করেছেন। সেটা কি আজ উপস্থিত? যেই গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেন শহিদ হয়েছেন। সেই গণতন্ত্র কি আজ উপস্থিত? তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্রের ধারা ফিরে আসল অর্থাৎ গণতন্ত্রের মাধ্যমে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা কি গণতান্ত্রিক চেতনা বাস্তবায়ন করেছে? এসব দেখে তো নূর হোসেনের আত্মা এখনো কাঁদে।

শেয়ার করুন