২২ অক্টোবর ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : তুমুল প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে সড়কে মৃত্যু কমিয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ পাস হয়। ১১১টি সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিতে সেসময় সড়ক ছেড়ে ঘরে ফেরে শিক্ষার্থীরা। আর সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ৬ ফা নির্দেশনা নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু সড়ক পরিবহন আইন ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কোনটারই বাস্তবায়ন নেই সড়কে। এখনও সড়কজুড়ে দীর্ঘশ্বাস। প্রতিনিয়তই ঝরছে তাজা প্রাণ।
শুক্রবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ইনিশিয়েটিভ, সেবক ও ড্রাইভার্স ট্রেনিং সেন্টারের এক জরিপ প্রতিবেদন বলছে, গত একবছরে গড়ে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। আর বিআরটিএ বলছে, মোট দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি ঘটে মোটরসাইকেলে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, প্রতিবছর সড়কে প্রায় ৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ও ৮০ হাজার মানুষ পঙ্গু হয়।
সড়কে মৃত্যু, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেই আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। কয়েক বছর ধরে প্রতিবছরের ২২ অক্টোবর দেশে এ দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটি ঘিরে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২২ উদযাপন উপলক্ষে আজ সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর দোয়েল চত্বর থেকে র্যালি বের করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এ উপলক্ষে ঢাকার মৎস্য ভবন মোড়, সাইন্সল্যাব মোড়, বাংলামোটর মোড়, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া আবুল হোটেল সংলগ্ন মোড় এলাকায় জনসচেতনতামূলক রোড শো পরিচালনা করবে বিআরটিএ। কর্মসূচিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), নিরাপদ সড়ক চাই, ব্র্যাক, রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউট সদস্যরা অংশ নেবে। এছাড়া এ দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে বলে জানা গেছে। ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২২ র্যালি, আলোচনা সভা এবং সপ্তাহব্যাপী জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।
সড়ক দুর্ঘটনারোধে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন, যাত্রী কল্যাণ সমিতি, নিরাপ সড়ক চাই, সেভ ্য রোড বলছে, সড়ক পরিবহন আইন ও প্রধানমন্ত্রীর সেই ৬ নির্দেশনা এবং গৃহীত ১১১টি সুপারিশের ছিটেফোটাও বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাশে রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্তরগুলোতে দুর্নীতি কমাতে হবে। নইলে সড়কে মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হতেই থাকবে। বাড়বে স্বজনহারারে কান্না, আহাজারি আর দীর্ঘশ্বাস।
তবে সড়ক নিরাপত্তায় সচেতনামূলক কাজ করা এসব সংগঠনের অভিযোগ মানতে নারাজ বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মাদ মজুমদার। গতকাল বিআরটিএ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, সড়কে নিরাপ করতে ১১১ সুপারিশের অধিকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকিগুলো বাস্তবায়নাধীন। তিনি বলেন, সরকার ফুটওভার, জেব্রাক্রসিং করে দিয়েছে, কিন্তু পথচারীরা ব্যবহার করে না। মোট দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি ঘটে মোটরসাইকেলে বলেও দাবি করেন বিআরটিএ প্রধান।
সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করতে বিধি চূড়ান্ত করা হচ্ছে জানিয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ৫/৭ জন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ঢাকা শহরে সড়ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। আইনের বিধান অনুয়ায়ী আনফিট গাড়ি রাস্তায় চলবে না। এ জন্য ১ হাজার ৭২৩ অভিযান পরিচালনা করে ১১ হাজার ৫৭৪টি মামলা হয়েছে। আর জরিমানা করা হয়েছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৬৩ হাজার ৭৫০ টাকা এবং ডাম্পিং করা হয়েছে ২০৬টি বাস। তিনি বলেন, কয়েকশ ম্যাজিস্ট্রেট দিলে আমি হয়তো আরও ফলাফল দিতে পারব। এ জন্য সরকারের কাছে ২ হাজার ৩১৫ জনবলের জনবলের চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে।
নিরাপদ সড়কের গুরুত্ব তুলে ধরে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে, আমাদের যে জনবল রয়েছে দেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্যে যথেষ্ট নয়। আইন মেনে যদি সড়কে চলি, তাহলে কোন দুর্ঘটনা ঘটবে না।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; বেপরোয়া গতি; চালকরে বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; তরুণ ও যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি ও গণপরিবহণ খাতে চাাঁবাজিকে দায়ি করেছে বেসরকারি সংগঠনগুলো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক গাইডলাইন প্রস্তুতকরণ, রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা ও বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ না করলে সড়কে মৃত্যুর মিছিলে প্রতিনিই যোগ হবে নতুন নতুন নাম। তারা বলছেন, সড়ক ব্যবস্থাপনায় সরকারি কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায় নিচ্ছে না কেউ। কোনো না কোন কর্তৃপক্ষকে বা সরকারকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। কমাতে হবে দুর্নীতি। তাহলেই শৃঙ্খলা ফিরতে পারে সড়কে।
বাংলাদেশ ইনিশিয়েটিভ, সেবক ও ড্রাইভার্স ট্রেনিং সেন্টারের জরিপ প্রতিবেদন বলছে, দেশে গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিনি ১৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। গত ১০ বছরে সড়কে প্রতিদিন গড়ে মারা গেছেন ১৪ জন। আর গত এক বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ৩৭১টি। এতে আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন, শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েছেন ১২ হাজার ৫০০ জন এবং মারা গেছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন।
অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিধান জরুরিভিত্তিতে চালু করার দাবি জানিয়েছে বাংলাশে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটি বলছে, প্রতিবছর সড়কে প্রায় আট হাজারের বেশি প্রাণহানির তথ্য মিলেছে। সংগঠনটির মহাসচিব মাজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি প্রাণ হারানোর কারণে ২৪ লাখ ৬২ হাজার ১০৬ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। যওি সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এ গঠিত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতরে আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৫ লাখ টাকা ও আহত ব্যক্তিকে ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকলেও আইন কার্যকরের ৩ বছরের মাথায় এ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যক্রম আজও শুরু করা হয়নি।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সারাবিশ্বে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩ লাখ মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে মারা যায় ২৪ হাজার ৯৫৪ জন।
বুয়েটের এআরআই’র হিসাব বলছে, গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় এমন ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। পুলিশের তথ্য ভান্ডার বিশ্লেষণ করে এআরআই জানিয়েছে, গত এক শকে দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরে ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর দুর্ঘটনায় নিহতরে সাড়ে ১৮ শতাংশ শিশু। এদের বয়স ১৫ বছরের নিচে।
যদিও দেশে সরকারি কোন প্তর সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করে না। তবে সড়ক দুর্ঘটনারোধ ও নিরাপ সড়ক নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪,৬৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সে হিসেবে এ বছর প্রতি মাসে গড়ে ৫৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর প্রতিনি গড়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। এর মধ্যে আগস্ট মাসে মৃত্যু হয়েছে ৫১৯ জনের, যার মধ্যে ৭৩ জন শিক্ষার্থী। আর এর আগের মাস জুলাইয়ে সড়কে মৃত্যু হয়েছে ৭৩৯ জনের। যার মধ্যে ১০৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।
সংগঠনটি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫,৪৩১ জনের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে ৭০৬ জন শিক্ষার্থী। আর ২০২১ সালে ৬,২৮৪ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮০৪ জন। সংগঠনটি বলছে, নিহতরে মধ্যে ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী রয়েছে।
তাদের তথ্য মতে, চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত গত ৩২ মাসে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয়েছে ১৬,৪০০ জন। সে হিসেবে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে সড়কে প্রাণহানি ৪.২২ শতাংশ এবং ২০২০ সালের চেয়ে ২০২১ সালে প্রাণহানি ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘পলিটিশিয়ানরা যতদিনে স্মার্ট না হবে, তারে মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনারোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা যতদিনে না আসে ততদিনে এই মৃত্যু, সড়কে এই নৈরাজ্য থামবে না।’ তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরে দায়িত্ব নিতে হবে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন আইনের কথা বলেন তারা, পরে এর বাস্তবায়ন ঘটে না।’
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ কাছে সড়ক দুর্ঘটনারোধে সড়কে সেইফটি ইন্সপেকশন, আনফিট গাড়ি চলতে না দেওয়া, স্পিড লিমিট গাইডলাইন প্রস্তুত, সড়কে বিভিন্ন ধরনের মার্কিং ও সাইন লাগানো, ঢাকায় গাড়ি ৩০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে না চলা, বেতনভুক্ত চালক নিয়োগ, চালকদের নিয়োগপত্র প্রদান, আনফিট গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে দিতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালুসহ দুর্ঘটনারোধে যে ১১১টি সুপারিশ ২০১৮ সালে নেওয়া হয়েছিল তা বাস্তায়নের কথা জানান।
২০১৮ সালের আগস্ট মাসের শুরুতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তারপরেও পরিস্থিতির কোন বল হয়নি। সে বিক্ষোভ শান্ত করতে সরকারের দিক থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট’-এর সভায় সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য ১১১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, দুর্ঘটনাগুলো আমারে হাতেই তৈরি। তাই এগুলোকে দুর্ঘটনা বলা যায় না। এটা ক্র্যাশ। চালক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ না হলে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে। চালকদের ক্ষ বানাতে হবে। শুধু দক্ষই নয়, চালকরে নিরাপদও বানাতে হবে। যেন যে কোনো পরিস্থিতিতে তারা সামাল দিতে পারেন। দেশে নিরাপদ চালক তৈরি করা খুব জরুরি।