১৭ অক্টোবর ২০২২


নগরীতে দ্বিগুণ দামেও মিলছে না চোখের ড্রপ!

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : নগরীতে বেড়েছে চোখ ওঠা বা কনজাংটিভাইটিস রোগের প্রাদুর্ভাব। ওষুধের দোকানগুলোতে দেখা দিয়েছে চোখের ড্রপের সংকট। দামও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন আক্রান্ত মানুষজন। চোখ ওঠা রোগী বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে কালো চশমার কেনাবেচা।

সরেজমিনে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, রাস্তায় অসংখ্য মানুষ কালো চশমা পরে যাতায়াত করছেন। হাসপাতালেও একই অবস্থা। প্রতিবছর গ্রীষ্মে চোখ ওঠা রোগের দেখা মিললেও এবার শরতে প্রভাব বেড়েছে। রোগীদের চোখের পাতা ফুলে লাল, চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছে। রোগীরা চোখের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে যাচ্ছে। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে এ রোগ।

বয়স্ক থেকে শিশু- প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন চোখের প্রদাহ রোগের চিকিৎসা নিতে ভিড় করছেন সিলেটের সরকারি-বেসরকারিসহ প্রতিটি হাসপাতালে, বিশেষ করে চক্ষু হাসপাতালগুলোতে। আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু। আক্রান্তরা জানান, হাসপাতালগুলোয় চোখের তেমন কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়ছেন রোগীরা। তাই ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই বাইরের ফার্মেসি থেকে ড্রপ কিনে ব্যবহার করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা জানান, চোখ ওঠা রোগটি মূলত ছোঁয়াচে ও ভাইরাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। কনজাংটিভাইটিস বা রেড/পিংক আইও বলা হয় এ রোগকে। আক্রান্তদের কারও কারও চোখ ওঠা তিনদিনে ভালো হয়ে যায়। আবার অনেকের তিন সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

নগরীর উত্তর বাগবাড়ী এলাকার শিবু দাস বলেন, চোখ ওঠা রোগে আমার পুরো পরিবার আক্রান্ত। প্রথম আমার চোখ ওঠে। এর পর একে একে ঘরের প্রায় সবার চোখ উঠেছে। ডাক্তার দেখিয়েছি, কিন্তু ওষুধ কিনতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। প্রায় ১০টা ফার্মেসি ঘুরে একটা চোখের ড্রপ কিনতে পেরেছি।’

কুমারপাড়ার আবুল কালাম বলেন, এক সপ্তাহ ব্যবধানে ফার্মেসীতে চোখের ড্রপের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। এক সপ্তাহ আগে আমার জন্য একটি ড্রপ ৭০টাকা দিয়ে কিনলেও মেয়ের জন্য শনিবার একটি ড্রপ কিনতে হয়েছে ১৪০ টাকায়। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান।

একই সমস্যার কথা জানালেন মিরাবাজার আগপাড়ার হুমায়ুন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমার ৮ মাসের নাতিসহ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের চোখ উঠেছে। ডাক্তার যে ওষুধ দিয়েছেন সেটা ফার্মেসিতে নেই। আমার নিজের পাড়াসহ অন্যান্য এলাকার প্রায় ২০টি ফার্মেসি ঘুরে ওষুধ পেয়েছি। তাও ডাক্তার যে কোম্পানির ওষুধ দিয়েছেন সেটা না। অন্য কোম্পানির ওষুধ নিয়েছি।’ তিনি বলেন, একেক ফার্মেসীতে চোখের ড্রপের দামও একেক রকম। একশ’ ১০ থেকে দেড়শ’ টাকা পর্যন্ত দাম নেয়া হচ্ছে। অথচ কিছুদিন আগেও ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় চোখের ড্রপ মিলত। হঠাৎ চোখের ড্রপের সংকট ও দাম বাড়ার বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছি না।’

আবু সাঈদ নামের অনার্সপড়ুয়া ছাত্র বলেন, ‘আমি সাত দিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগতেছি। হাসপাতালে গিয়ে দেখি অসংখ্য রোগী। পরে চলে এসেছি। বাইরেও যাই কালো চশমা পরে। ড্রপ দিয়েও তেমনটা কাজে আসছে না।

রাসেল মিয়া নামের এক ভ্যানচালক বলেন, ‘আমি একাধিক ওষুধের দোকানে ঘুরেছি। ড্রপ পাওয়া যায় না। জয়দেব মোদক বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি দুচোখ লাল। তাকাতে পারছি না। বাড়ির আরো কয়েকজনেরও একই অবস্থা। ‘

সরেজমিনে নগরীর বেশ কয়েকটি ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চোখ ওঠা রোগীর অনুপাতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ড্রপ সরবরাহ করতে পারছেন না। নগরীর ডাক্তারপাড়া খ্যাত স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকার ফার্মেসিগুলোতে চোখের ড্রপ মিললেও দাম ও কোম্পানীর মিল নেই। দামও ভিন্ন। আবার সরবরাহ না থাকার অজুহাতে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা ৩০-৫০ টাকার ড্রপ ৬০-১৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন।

ফেয়ার মেডিকেল স্টোরের প্রোপ্রাইটর কিষানু সাহা বলেন, হঠাৎ চোখ ওঠা রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাই ড্রপসহ এই রোগ সংশ্লিষ্ট ওষুধের কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সব কোম্পানী ড্রপসহ ওষুধ সরবরাহ করতে পারছে না। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

ঔষধ তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়, সিলেটের তত্ত্বাবধায়ক শিকদার কামরুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করে কনজাংটিভাইটিসের (চোখ ওঠা রোগ) প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় ওষুধের বাজারে ড্রপের কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কেন না চোখের এই ড্রপ কোম্পানিগুলো স্টক করে রাখে না। এ ছাড়া এই ওষুধের খুব প্রয়োজনীয়তা দেখা না দিলে বেশি ব্যবহারও হয় না। তাই হঠাৎ করে এত রোগী সংক্রমিত হওয়ায় ওষুধের কিছুটা ঘাটতি ছিল। এখন স্বাভাবিক হচ্ছে।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম অচিনপুরী বলেন, ‘চোখ ওঠা রোগ সাধারণত এক ধরনের ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ। এডিন নামক এক ধরনের ভাইরাস এই রোগের মূল কারণ। তবে এবার ধরন আমাদের কাছে কিছুটা ব্যতিক্রম বলে মনে হচ্ছে। এটা যেহেতু ছোঁয়াচে রোগ, তাই যার হয়েছে, তিনি চোখে হাত দেওয়ার পর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেললে তার মাধ্যমে অন্যরা আক্রান্ত হবে না।’

তিনি বলেন, ‘কারণ আক্রান্তরা যদি কোনো জায়গায় হাত দেয়, সেই জায়গায় অন্যরা হাত দিলে বা স্পর্শ করলে তারাও আক্রান্ত হবে। আমরা যারা প্রতিদিন রোগী দেখছি, আমাদের হচ্ছে না। কারণ আমরা সতর্ক আছি। রোগী দেখি, হাত ধুয়ে ফেলি। রোগীও যদি বাসায় সতর্ক থাকে, তার বাসায় অন্যদের হবে না।’

‘যেসব রোগী বাসায় আছেন, তাদের ব্যবহৃত রুমাল, গামছা, কাপড়চোপড় অন্যরা যাতে ব্যবহার না করে’- সেদিকে খেয়াল রাখতে রাখার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
তিনি আরও বলেন, ‘এমন অবস্থায় রোগীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সতর্ক থাকতে হবে। সাধারণত ৩-৫ দিনেই মধ্যেই চোখ ওঠা রোগ এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে এই সময়ের মধ্যে ভালো না হলে তাকে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এছাড়া যারা চাকরি করে ও যেসব বাচ্চা স্কুলে যায়, তাদের চোখ ওঠা রোগ হলে অবশ্যই ছুটি নিতে হবে। কারণ এটা সংক্রামক ব্যাধি।’

শেয়ার করুন