১৪ অক্টোবর ২০২২


লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : জ্বালানি সংকটের ফলে বন্ধ রয়েছে অন্তত ৪৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন । জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো পুরোদমে চালু করা সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে সারাদেশে বেড়ে গেছে অনিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং। ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তির মুখে রয়েছে জনজীবন।

ঘোষণা দিয়ে জুলাই মাসে লোডশেডিং শুরু করার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বর থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরের মাঝামাঝিতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। দিনে চার থেকে পাঁচ বার করে বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করছে। রুটিন মেনে লোডশেডিংয়ের নিয়ম আর মানা হচ্ছে না। এমনকি বাদ যাচ্ছে না ছুটির দিনও।

ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন, একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে অত্যধিক গরমের কারণে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘটছে ব্যাঘাত। নবজাতক ও অসুস্থ রোগীরা লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন। এছাড়া বিদ্যুতের অভাবে রাজধানীতে পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

মগবাজারের বাসিন্দা সুজানা ইসলাম বলেন, ‘গরমের মধ্যেও দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এজন্য বাসায় পানিও ঠিকমেতা পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে গরম, একই সঙ্গে মশার উপদ্রব, তার সাথে দেখা দিয়েছে পানির সঙ্কট। এইসব নিয়ে আমরা অনেক কষ্টে দিন পার করছি।’

নাখালপপাড়ায় বাসিন্দা গৃহিনী আফরোজা আক্তার বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের ফলে অসহ্য অবস্থা পার করছি। একে তো অনেক গরম, তার উপরে এত বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, যেটা বলার মতো না। রাত ১২ টার পর থেকে সকাল পর্যন্ত তিন বার লোড শেডিং হলো। প্রচণ্ড গরমে ঘুমাতে না পেরে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এছাড়া বারবার বিদ্যুতের যাওয়া আসায় ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ওপর চাপ পড়ছে। আমার ফ্রিজের একটা পার্ট নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ফ্রিজের খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য সামগ্রী এখন সাবধানে ব্যবহার করতে হচ্ছে।’

ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন নাকাল পরিস্থিতিতে। বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতা সংকটে ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। ছুটির দিনেও বিদ্যুৎ থাকছে না। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দিনে-রাতে গড়ে এক ঘণ্টা করে ৪-৫ বার হচ্ছে লোডশেডিং। পিক আওয়ারে অতিরিক্ত লোডশেডিং হওয়ায় ক্রেতারাও আসছেন না। ফলে কমে গেছে কেনাবেচাও। অপরদিকে শিল্প কারখানার উৎপাদন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

মৌচাক মার্কেটের তামান্না ফ্যাশনের ম্যানেজার আবদুল আলিম বলেন, ‘বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমে ক্রেতারা মার্কেটে আসতে চান না। সবসময় জেনারেটরের ব্যাকআপও পাওয়া যায় না। আর এতোবার লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর দিয়েও কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। ফলে আগের তুলনায় বেচা বিক্রি কমে গেছে আমাদের।’

এদিকে আবাসিক বাড়ির জেনারেটরের তেল কেনার জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের ভিড়। তবে অধিক সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় জেনারেটরও সাপোর্ট দিচ্ছে না। ফলে আবাসিক বাড়ির বাসিন্দারা পড়েছেন বিপাকে।

অপরদিকে ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের সংকট দেখা দেয়ায় ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ি ও সিএনজি অটো রিকশার চালকদের। তারাও চরম বিরক্ত।

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে ব্যহত হচ্ছে ব্যাংকিং কার্যক্রম। সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন গ্রাহকরা। এছাড়া এটিএম সেবাতেও বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে এটিএম বুথ। কারওয়ান বাজারের এক বেসরকারী ব্যাংকে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুতের অভাবে কর্মকর্তারা বসে আছেন। গ্রাহকরাও বিদ্যুৎ আসার জন্য অপেক্ষা করছেন। সবার কম্পিউটার পিসি বন্ধ। ভেতরে অন্ধকারময় পরিবেশ।

বিতরণকারী সংস্থাগুলো বলছে, সঙ্কটের মধ্যে অক্টোবরে গরম বেড়েছে। যা পরিস্থিতি নাজুক করে তুলছে। চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না, ফলে কর্তৃপক্ষও অসহায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দেশে ১০ হাজার ৫৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। আর রবিবার পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৫৪১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের।

বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হওয়ার মধ্যে গরমে চাহিদা বেড়েছে। গরম না কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা দেখছেন না তারা।

বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা বলছেন, যখন প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন, তখন বেশ কয়েকটি কারণ মিলে সঙ্কট তীব্র হয়েছে। বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনেকগুলো ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ আছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে। বেশ কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ৪-৫ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে, সে কারণে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে।
বিপিডিবির তথ্য কর্মকর্তা শামীম হাসান বলেন, ‘গ্রিড থেকে আমরা যতটুকু বরাদ্দ পাচ্ছি, সে অনুযায়ী বিতরণ করছি। যদিও চাহিদার পরিমাণ বেশি।’

কিন্তু গ্যাসের সঙ্কট থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রোস্টারভিত্তিক লোডশেডিংয়ের শিডিউল মানা যাচ্ছে না উল্লেখ করে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, ‘দিনে ও রাতে ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি হচ্ছে। যে কারণে কিছু এলাকায় লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। এতে করে লোডশেডিংয়ের শিডিউল মানা যাচ্ছে না।’

শেয়ার করুন