৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : ঘরের বাইরে পা রাখলেই একের পর এক নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য । উঁচু-নিচু পাহাড়। সুউচ্চ টিলাভুমি। বহমান প্রাকৃতিক জলরাশি। অসংখ্য চায়ের বাগান। আদিবাসী পল্লী। ইকোপার্ক।লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিশাল বিশাল হাওর। এমন নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভুমি মৌলভীবাজার। একটি পর্যটন জেলার জন্য সব আকর্ষণই এখানে বিদ্যমান। বিগত বিএনপি সরকারের সময় এই জেলাকে পর্যটন জেলা ঘোষণাও করা হয়। কিন্তু হয়নি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। ফলে দিনদিন এখানে পর্যটকের সংখ্যা কমছে। সরকারি হিসেবে গত এক বছরে অন্তঃত ৫০ শতাংশ পর্যটক এই জেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব। এখানের বিশিষ্ট নাগরিকরা মনে করেন পর্যটন খাতের এই দুরবস্থার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতাই দায়ী। তাদের অভিযোগ, মুখে পর্যটন জেলা আর কয়েকটি মতবিনিময় সভা করেই দায় এড়ানো হচ্ছে। এভাবে দেশী-বিদেশি পর্যটকেরা চলে আসবেন না। সেজন্য প্রয়োজন কার্যকর অনেক পদক্ষেপ, যা এখানে নেই।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৭ উপজেলা ও ৫ পৌরসভা নিয়ে মৌলভীবাজার জেলার আয়তন ২ হাজার ৭৯৯ বর্গকিলোমিটার। এখানের জনসংখ্যা ২০ লাখ। আছে ৪৫ হাজার নৃগোষ্ঠীর নাগরিক। দেশের ১৬৭ টি বাণিজ্যিক চা বাগানের ৯৩টির অবস্থান মৌলভীবাজার জেলায়। চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজার জেলায় আছে দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক জলরাশি মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। কালা পাহাড় ও হাম হাম জলপ্রপাত, মুড়াইছড়া, মাধবকুণ্ড ও বর্ষীজোড়া ইকোপার্ক এই জেলায় অবস্থিত। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও মাধবপুর লেক, গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট সহ আরও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। চা গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিটিআরআই)আসাম- বাংলা রেলপথ, কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন ও শমসেরনগর বিমান ঘাঁটি এই জেলার অন্যতম। এশিয়ার পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হাকালুকি, কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওর মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। বাংলাদের পর্যটন কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসন পর্যটন খাতের উন্নয়নে বেশ কয়েকটি সভাও করে। কিন্তু বাস্তবে দিন দিন এখানে পর্যটকের সংখ্যা কমছে। মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলো দিন দিন দর্শকশুন্য হয়ে পড়ছে। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক, মাধবপুরলেকসহ এখানের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখন দর্শনার্থীদের অভাবে অনেকটা খাঁ খাঁ করছে। পাশাপাশি ধস নেমেছে এখানের হোটেল মোটেল রেস্টুরেন্ট ব্যবসাসহ পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসা বাণিজ্য। এসব ব্যবসায় লোকসানের খাতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
বণ্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য মতে এখানের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে গত রোজার ঈদে ৮ দিনে এসেছিলেন ৩৪ হাজার পর্যটক। কিন্তু কোরবানির ঈদে এসেছেন মাত্র ৭ হাজারের মতো। এমনকি ২০২১ সালের ২০ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যেখানে ১০ হাজার ৩৭২ জন পর্যটক এসেছিলেন সেখানে এবছর একই সময়ে এসেছেন মাত্র ৩ হাজার ৮৩১জন। অনুরূপ মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে ২০২১ সালের ২০ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসেছিলেন ৩৩ হাজার ২১২ জন সেখানে এ বছর এসেছে ২৫ হাজার ২৪১ জন।
মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আব্দুল হামিদ মাহবুব বলেন, একজন পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য যা যা প্রয়োজন সবই আছে আমাদের মৌলভীবাজারে। চা শ্রমিক খাসিয়া মনিপুরি গারো হাজংসহ ১৭টি আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস এখানে। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক, হাওর নদী টিলা পাহাড় সবই আছে এই মৌলভীবাজারে। একই সঙ্গে এতো বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশ দেশের আর কোথাও নেই। পর্যটন জেলাও ঘোষণা করা হয়েছে । কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত পর্যটকদের আকর্ষণে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় প্রশাসন পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য দুটি বাস চালু করেছে। কিন্তু পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য যে মানের বাস প্রয়োজন সে চাহিদা মিটছে না। এছাড়া হয়নি সড়ক মহাসড়ক। নেই কোনো দৃশ্যমান প্রকল্প। আঞ্চলিক সড়কে যাতায়াত করতে হয় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্পটে সহজ যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তাই এতো দর্শনীয় স্পষ্ট থাকার পরও পর্যটকেরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) স্থানীয় সমন্বয়কারী এবং মৌলভীবাজারের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, পর্যটন জেলা করার যে কথা বলা হচ্ছে পুরোটাই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। কই? কোথাও তো কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখি না। পর্যটন জেলা হলেতো সেভাবে হোটেল মোটেল, গেস্টহাউজ রাস্তাঘাট অফিস আদালত নির্মিত হতো।
মৌলভীবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন, আমরা প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান কে দিয়ে পর্যটন জেলা ঘোষণা করে বেশ কিছু কার্যক্রম করেছি। কিন্তু বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার অভাবে এখন সবই বন্ধ তাই পর্যটকেরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
জাতীয় পার্টি( জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি নওয়াব আলী আব্বাস খান বলেন, এখানে দর্শনীয় স্থানগুলোর প্রচার প্রচারণা নেই। গড়ে ওটেনি প্রয়োজনীয় অবকাটামো। তাই পর্যটকদের বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়।
জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান মিটিংয়ে থাকায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, আরও একটু অপেক্ষা করেন। সব ঠিক হয়ে যাবে। বড়লেখা উপজেলার হাল্লা পাখি বাড়ির সংরক্ষণ ও উন্নয়নে ১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের তাড়াতাড়ি টেন্ডার হবে। এছাড়া বর্ষীজোড়া ইকো পার্ক, লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের উন্নয়নের জন্য বড় আকারের একটি প্রকল্প আমরা বন ভবনে জমা দিয়েছি।