১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মধ্যে এবার কপালে শঙ্কার ভাঁজ ফেলছে গ্যাস ঘাটতি। দেশের কূপ থেকে উৎপাদন কমছে। আবার এলএনজি আমদানিও বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে দেশে দৈনিক চাহিদার তুলনায় একশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংকট তৈরি হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞের।
দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ফলে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। কিন্তু গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র বাড়েনি। ফলে গ্যাসের চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। চাহিদা সামাল দিতে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে যে খরচ হয়, এলএনজি আমদানিতে তার ৭ থেকে ১০ গুণ বেশি খরচ হয়। এতে জ্বালানি বিভাগের ওপর ভর্তুকি চাপ বেড়েই চলেছে।
দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা মিলিয়ন ঘনফুট। সঙ্কট শুরুর আগে সরবরাহ করা হতো ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৭৫ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যার মধ্যে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসছে দেশীয় উৎস থেকে। আর আমদানি করা এলএনজি যোগ হচ্ছে ৪৮ কোটি ঘনফুট। যা কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ভিত্তিতে আসছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা পূরণে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোয় অনেকাংশেই পিছিয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলো। ফলে, গ্যাস উৎপাদনকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর যেমন নির্ভরশীলতা বাড়ছে, একইসঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির দিকেও ঝুঁকছে দেশ।
২০০৪ সালে গ্যাস উৎপাদনে ৭৬ শতাংশ অবদান ছিল দেশীয় কোম্পানিগুলোর। তখন ২৪ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন করত বিদেশি কোম্পানি। আড়াই দশকের ব্যবধানে গ্যাস উৎপাদনে দেশীয় কোম্পানিগুলোর অবদান ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২৩৪ কোটি ৮৫ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি দুই কোম্পানি উৎপাদন করেছে প্রায় ১৪৮ কোটি ঘনফুট, যা মোট উৎপাদনের ৬৩ শতাংশের বেশি। আর ওই দিন দেশি তিন কোম্পানি উৎপাদন করেছে ৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুট, যা মোট উৎপাদনের ৩৭ শতাংশের কম। গত আড়াই দশকে বিদ্যমান গ্যাস উৎপাদনের ৬৩ ভাগ চলে গেছে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দখলে। অথচ ১৯৯৮ সালের আগ পর্যন্ত শতভাগ উৎপাদন করত দেশীয় কোম্পানি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কাতার থেকে বার্ষিক ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৭ সাল থেকে ১৫ বছর মেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে আসছে বাংলাদেশ। কাতারের রাশ লাফান লিক্যুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ওই চুক্তির আওতায় বার্ষিক ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি পাওয়ার কথা বাংলাদেশের।
তবে সংকটের কারণ দেখিয়ে অতিরিক্ত হিসেবে বছরে আরও ১ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির জন্য বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রস্তাব দিলেও কাতার তাতে সাড়া দেয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের দেশগুলোতে তাদের এলএনজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের আগে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে কাতার।
বর্তমানে দেশটি থেকে মাসে ৫টি করে এলএনজি কার্গো আসছে। যার ইউনিট প্রতি গ্যাসের দাম পরছে ১৫ মার্কিন ডলার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ১০ ডলারের কম। কিন্তু খোলাবাজারে এই দাম ৬০ ডলারের বেশি। তাই দাম সহনশীল না হওয়া পর্যন্ত খোলাবাজার থেকে গ্যাস কেনা বন্ধ রাখছে সরকার।
দেশের গ্যাসের মোট চাহিদার ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে বিদ্যুত উৎপাদনেই ব্যবহৃত হয় ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সার কারখানায় লাগে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে বিদ্যুতে মাত্র ১০৬ মিলিয়ন এবং সারে ১৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
এদিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় তীব্র গ্যাস সঙ্কটে ভুগতে হচ্ছে মানুষজনকে। রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকার আবাসিক চুলাগুলোতে গ্যাসের চাপের অভাবে চুলা জ্বলছে না। উৎপাদন বন্ধ রয়েছে শিল্প কারখানাগুলোতে। গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলায় আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কূপগুলোতে খননের তাগিদ দিচ্ছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ইউরোপে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে কাতার থেকে এলএনজি পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কাতার যদি এখন অতিরিক্ত এলএনজি দিতে না চায়, তাহলে আমরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে এলএনজি চুক্তির বিষয়ে কথা বলতে পারি।’
বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন ম. তামিম। বলেন, ‘আমদানির দিকে না তাকিয়ে পেট্রোবাংলা বা বাপেক্সকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুরোনো কূপগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন পুনরায় শুরু করা গেলে ২০২৫ সালের মধ্যে দৈনিক অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের চাহিদা মিটবে। এতে এলএনজির ওপর চাপ কমবে আবার দেশে যে গ্যাসের সংকট তাও অনেকাংশ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।’