১২ সেপ্টেম্বর ২০২২
ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের সবচেয়ে পুরানো হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সেখানে একটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৪৯ কোটি টাকায় সিলেট-১০ নম্বর কূপ খনন করবে চীনা কোম্পানি সিনোপেক। এ লক্ষে রোববার সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানির সঙ্গে সিনোপ্যাক ইন্টারন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশন, চায়না’র সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রক্রিয়ায় আগ্রাধিকার অব্যাহত রাখা হবে। বাস্তবসম্মত প্রকল্প নিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকাজ বাড়ানো আবশ্যক। গৃহীত প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই বাস্তবায়ন করতে হবে। এ কূপ থেকে দৈনিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য টার্ন-কি ভিত্তিতে ভূমি উন্নয়ন ও পূর্ত নির্মাণ কাজ, খনন মালামাল সরবরাহ, তৃতীয়পক্ষীয় প্রকৌশল সেবা ও কূপ খননের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা হবে।
উল্লেখ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে সৃষ্ট গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের সবচেয়ে পুরানো হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১০ নম্বর কূপ খননের কাজ পায় চীনা কোম্পানি সিনোপ্যাক ইন্টারন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশন।
সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানির আওতায় এই কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল কাদের ভূঁইয়া বলেন, হরিপুর গ্যাসফিল্ডে মোট নয়টি গ্যাস কূপ রয়েছে। সিনোপেককে ১০ নম্বর কূপ খননের কাজ দেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানির আওতায় থাকা হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রে চার’শ বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস রয়েছে এবং সেখান থেকে দৈনিক কমপক্ষে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। এই উৎপাদন জাতীয় গ্রীডে দেয়া সম্ভব হলে গ্যাস সংকট কিছুটা কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় সর্বোচ্চ দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়, যার বড় অংশ দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত হয়। এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত কন্ডেনসেট থেকে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যায়। গ্যাস শুধু জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয় না, দেশের শতকরা ৬৫ ভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাসে পরিচালিত হয়। এ ছাড়াও, সার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসাবে গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে মোট ২৬টি গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে যেগুলোর অধিকাংশই বৃহত্তর সিলেট জেলায়। সবকটি গ্যাস ক্ষেত্রের মধ্যে হবিগঞ্জের বিবিয়ানা থেকে দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৫০ ভাগ গ্যাস আসে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির আওতায় থাকা চারটি গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে। সেগুলো হলো; হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র, কৈলাসটিলা গ্যাস ক্ষেত্র, রশিদপুর গ্যাস ক্ষেত্র এবং বিয়ানীবাজার গ্যাস ক্ষেত্র। দেশের প্রয়োজনীয় গ্যাসের ঘাটতি কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তরলীকরণ করে আমদানি করা হয়। তরলীকৃত গ্যাস দেশে পুনরায় গ্যাস আকারে ব্যবহার করা হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার তেল-গ্যাস বিক্রির ওপর পশ্চিমা অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ঘনফুট গ্যাস সর্বোচ্চ পাঁচ ডলারে কেনা যেতো। সেই একই পরিমাণ গ্যাসের দাম ৫০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।
এই অস্বাভাবিক দামের কারণে সরকার বিদেশ থেকে এলএনজি কিনছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন শিল্প, কলকারখানাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে এসেছে এবং সারাদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির আওতায় চার ক্ষেত্রের বর্তমান অবদান খুব বেশি না হলেও তা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
কোম্পানির পরিচালক বোর্ডের সভার কার্যপত্রে বলা হয়, হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরানো এবং এই ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত নয়টি কূপ খনন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মেসার্স স্লুমবার্গার সিয়াকো কোম্পানির সাম্প্রতিক একটি ত্রিমাত্রিক জরিপ অনুযায়ী হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে চার’শ ছয় বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৫ সালে শুরুর পর থেকে হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত ২১৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, যদি হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রে চার’শ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকে সেক্ষেত্রে সেখান থেকে দৈনিক ৭০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাবে।
এর আগে দেশের প্রাচীনতম এই গ্যাস ক্ষেত্রটির ৯ নম্বর কূপে গত বছরের ২ অক্টোবর খননকাজ শুরু করে পেট্রোবাংলার অধীন আরেকটি কোম্পানি বাপেক্স। তাদের করা ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের ভিত্তিতেই কূপটি খননের স্থান ও গভীরতা নির্ধারণ করা হয়। এসজিএফএল সূত্র জানায়, ভূকম্পন জরিপের ফলের ভিত্তিতে এই কূপে তেল পাওয়ার আশা করা হয়েছিল। কূপটি খনন করার কথা ছিল ২ হাজার ১০০ মিটার গভীর। কিন্তু ২ হাজার ২৫ মিটার পর্যন্ত খনন করার পর ড্রিলিং পাইপ আটকে যায়, যা প্রচলিত কোনো পদ্ধতিতেই ছাড়ানো যায়নি। ভূতাত্ত্বিক জটিলতা এবং খননকাজ পরিচালনায় ত্রুটির কারণে এটা হয়ে থাকতে পারে।
হরিপুর ১৯৫৫ সালে আবিষ্কৃত এ দেশের প্রথম গ্যাস ক্ষেত্র। ১৯৬০ সালে ক্ষেত্রটির ১ নম্বর কূপ থেকে দৈনিক ৪০ লাখ ঘনফুট করে গ্যাস ছাতক সিমেন্ট কারখানায় সরবরাহ শুরু হয়। বাংলাদেশে শিল্পে গ্যাস ব্যবহারও সেই প্রথম। সে ছিল এক নতুন যুগের সূচনা। এরপর ১৯৬১ সালে এই ক্ষেত্রের আরেকটি কূপ থেকে ৩০ মাইল দীর্ঘ ও ৮ ফুট ব্যাসের পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয় ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রে ছয়টি কূপ খনন করা হয়।
তবে একাত্তর সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সময় এর দুটি কূপ চালু ছিল। হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রটি আরও যে কারণে ঐতিহাসিক তা হলো এই ক্ষেত্রেই প্রথম ব্লো-আউট (কূপ খননকালীন বিস্ফোরণ) হয়। আবার এটিই দেশের প্রথম এবং একমাত্র তেলক্ষেত্র। স্বাধীনতার পর ১৯৮৬ সালে হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রে ৭ নম্বর কূপ খনন করা হয়। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর ৭ নম্বর কূপে তেল পাওয়া যায়। প্রায় ৭ বছরে মোট ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮৬৯ ব্যারেল তেল উত্তোলনের পর ১৯৯৪ সালের ১৪ জুলাই কূপটিতে তেলের চাপ (ওয়েলহেড প্রেসার) প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেলে তেলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভে তেলের সঙ্গে মোম জাতীয় একটি পদার্থ (ওয়াক্স) থাকে। তেল উত্তোলনের সময় ওই ওয়াক্স কূপের পাইপের গায়ে জমতে থাকে, যাতে তেলের প্রবাহ বিঘ্নিত হয়। তাই কূপে তেলের প্রবাহ অব্যাহত রাখার জন্য নিয়মিত ওই ওয়াক্স পরিষ্কার করতে হয়। হরিপুর ৭ নম্বর কূপে তা করা হয়নি। সেই কারণে ওয়েলহেড প্রেসার কমে গিয়ে তেলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালে ক্ষেত্রটিতে ৮ নম্বর কূপ খনন করা হয়। সেই কূপেও তেল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পাওয়া যায় গ্যাস। এরপর বাপেক্স ক্ষেত্রটিতে ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ চালায়। তার ভিত্তিতে ৯ নম্বর কূপ খনন করা হয়।