৮ আগস্ট ২০২২


কারবালার ইতিহাস থেকে শিক্ষা

শেয়ার করুন

রুহুল আমিন হাসান : ৬২ হিজরি সনে, আজকের ইরাকের কুফা নগরীর পাশে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মরু-প্রান্তরে ঘটে যাওয়া নির্মম ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দিকে যদি ফিরে তাকাই তবে আমরা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বেদনার্ত হতেই পারি; বিশ্ব মুসলিমের তো কথাই নেই। ঐদিন আহলে বাইত বা নবী মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবারের উপর নেমে আসে দানবীয় হত্যাযজ্ঞের তরবারি। আর তখন দুধের শিশু থেকে নারী, কিশোর যুবা থেকে পরিণত সবাই তপ্তমরুর বুকে পিপাসায় ক্লান্ত, বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ফোরাতের পানীয় জল। সবাই শুকনো গলায় চিৎকার করছিলেন মরণ পিপাসায় কাতর হয়ে।

ইমামের সহযোগীদের হত্যা করা হয় একে একে, এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশু আব্দুল্লাহকে এবং কিশোর কাশেমকে। কী মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক এই কাহিনী। দিনটা ছিল মুহররমের ১০ তারিখ, যা আজ বিশ্ব মুসলিমের কাছে ‘আশুরা’ নামে হৃদয়ে গ্রথিত। আর এই শোকাবহ ঘটনা আন্দোলিত করে বিশ্ব মুসলিমের বাইরে যে-কোন বিবেকবান মানুষকেও। মানুষ মাত্রই কেঁদে উঠেন এর ভয়াবহতার মাত্রা দেখে ও বুঝে নিয়ে।

আরবিতে দশ সংখ্যা হচ্ছে আশারা, এর থেকেই আশুরা শব্দের উৎপত্তি। বিগত চৌদ্দশত বছর ধরে আশুরা মানেই হচ্ছে হিজরি ৬২ সালের ১০ মুহররমের কালো অধ্যায়। বিশ্ব-মানবতার আদিকাল থেকে আজকের ইতিহাসের এমন কোন ঘটনা এমন করে মানবজাতিকে এতোটা শোকাবহ করেনি, করতে পারেনি।

ইসলামের ইতিহাসে সেই আদি মানব আদম (আ.) এর আমল থেকে মুসা (আ.) পর্যন্ত অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষী এই আশুরা। এর সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে, ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদত বরণ, আহলে বাইতের ১৭ সদস্যকে নিয়ে ইমাম হোসাইন হচ্ছেন নবী মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র, চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) দ্বিতীয় সন্তান ও নবী দুহিতা মা-ফাতেমা (রা.) বুকের ধন, কলিজার টুকরা।

ইমাম হোসাইন ন্যায় ও নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে প্রতিবাদ করতে ও সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে কুফাবাসীর আমন্ত্রণে মক্কা থেকে রওয়ানা হন কুফার পথে। পথিমধ্যে স্বঘোষিত খলিফা ইয়াজিদের আদেশে পথ রুখে দেয় কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের বাহিনী, ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মরুপ্রান্তরে। পঞ্চম খলিফা আমির মুয়াবিয়ার লিখিত আদেশে তাঁর পুত্র ইয়াজিদ দাবী করেন খেলাফত। এটা ছিল একটা অন্যায় নির্দেশনা এবং ভবিষ্যতে খেলাফত থেকে রাজকীয় হুকুমত প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ; ইমাম হোসাইনের দূরদৃষ্টিতে যা পরবর্তীতে প্রমাণিত। শুধুই ইমাম হোসাইন নয় আরও অনেক বড় বড় বিজ্ঞ সাহাবীরাও ,মক্কা ও মদিনার, মেনে নিতে পারেননি এই নির্দেশ। ইমাম নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অটল থাকেন। কুফার পথে যাত্রা শুরু করেন আন্দোলন সংঘটিত করতে।

কুফা পৌঁছার আগে ফোরাত তীরে কারবালায় তাঁবু খাটিয়ে নেন ইমাম বাহিনী। পাষণ্ড শিমারের নেতৃত্বে, অস্ত্রসজ্জিত হাজার হাজার সেনাসদস্য নিয়ে পথ রুখে দেয় ইমামের; বন্ধ করে দেয় ফোরাতের পানীয় জল। শেষমেশ একে একে নিহত হন আহলে বাইতের ১৭ জন সদস্যসহ ৭২ জন সঙ্গী।

ইমাম হোসাইনের বয়স তখন সাতান্ন বৎসর, হিজরতের চতুর্থ সালে জন্ম। রাসুল (সা.) এর কোলেপিঠে শিশুকাল, বড় ভাই ইমাম হাসানসহ। পরবর্তীতে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মেধায় হয়ে ওঠেন একজন বিচক্ষণ ব্যাক্তি। সঙ্গত কারণেই মেনে নিতে পারেননি ইয়াজিদের খেলাফতের বাইয়াতের আদেশ বা আনুগত্যের শপথ। ক্ষেপে গিয়ে ইয়াজিদের নির্দেশ, জীবিত অথাবা মৃত, ইমামকে দামেস্কে নিয়ে আসার ফরমান। ইমাম মদিনা ছেড়ে মক্কায় ও পরবর্তীতে কুফার পথে, হাজার হাজার কুফাবাসীর পত্র-লিখিত আহবানে।

নির্ভয় ইমাম কেঁপে উঠেননি জীবনদানের ভয়ে, শাহাদতের পথ বেছে নিতে তৈরি করে নেন নিজেকে। ইয়াজিদের আনুগত্য মানেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা, প্রয়োজনে জীবন দেবেন, জিহাদে আত্মদান করবেন; একমাত্র মহান প্রভু আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করবেন, এই দৃঢ়-বিশ্বাসে। ইমামের আদর্শ একটাই, মৃত্যু যেহেতু নির্ধারিত, শহীদি মৃত্যুই মধুর চেয়ে মধুময়।

ইতিহাসের পাতায় ৬২ হিজরি সনের ১০ মুহররমে ইমামের শাহাদত বরণ, ইতিহাসের পাতায় জঘন্যতম ও নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ড। আর আজ আশুরা মানেই হচ্ছে ন্যায়ের পথে আত্মদানের অভিপ্রায়ে বলীয়ান হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শপথ , তেজোদীপ্ত স্বরে।

(লেখক : চিকিৎসক।)

শেয়ার করুন