২৭ জুলাই ২০২২


অর্থ পাচার তদন্তে ক্ষমতা পেল দুদক

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী দেশের বাইরে বিনিয়োগ বা অর্থ স্থানান্তর করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। ফলে অবৈধভাবে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে দেদার। এসব অর্থ ফেরত আনা যাচ্ছে না।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর দিয়ে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ঘোষণা এলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এখনো। এমন বাস্তবতায় অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আবার মাঠে নামতে চায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

হাইকোর্টের দেয়া এক রায়ের আলোকে কমিশন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ধারায় পড়ে এমন সব ধরনের সংগঠিত অপরাধ এখন থেকে তদন্ত করতে পারবে। উচ্চ আদালতে দেয়া এই রায়ের মধ্য দিয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটির অনুসন্ধান ও তদন্তে এখতিয়ার আরো বাড়ল।

দুদক কমিশনার জহুরুল হক বলেন, ‘মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত ২৭টি অপরাধের বিষয়ে পুনরায় তদন্ত ও মামলা করতে পারব আমরা। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে এত দিন এ-সংক্রান্ত অপরাধের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচাররীদের ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’ এই একটি বিষয় ছাড়া অন্য কোনো অপরাধ তদন্তের এখতিয়ার ছিল না দুর্নীতি দমন কমিশনের।’ তবে কমিশন গঠনের সময় মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত সব অপরাধ দুদক তদন্ত করতে পারত বলে জানান তিনি।

হাইকোর্টের দেওয়া সেই রায়ের ২৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, ‘মানিলন্ডারিং অপরাধের অর্থ পাচারে যে ২৭টি উপায় রয়েছে তার মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি এবং ঘুষ। এগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর সব তফসিলভুক্ত অপরাধ। সুতরাং, আমরা মনে করি যে দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতি ও ঘুষের উপাদান আছে এমন যেকোনো অপরাধের তদন্ত করতে সক্ষম।’ এই রায়ের মধ্য দিয়ে অর্থ পাচারে সব ধরনের বিষয় তদন্ত করতে পারবে দুদক।’

উচ্চ আদালতের রায়ের বিষয়ে দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘মানি লন্ডারিংয়ের বিষয় দুদক আগে সম্পূর্ণই তদন্ত করতে পারত, মাঝখানে আইন সংশোধনের কারণে এ-সংক্রান্ত কিছু ক্ষমতা দুদক থেকে চলে যায়। আমরাও সন্দিহান ছিলাম কী করব। সম্প্রতি (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২) মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ একটি রায়ে বলেছেন, দুদকের ‘সিডিউলভুক্ত অফেন্স’ যেগুলো আছে সবগুলোই দুদক তদন্ত করতে পারবে। দুদকের সেই ক্ষমতা আছে।’

কোর্টের রায়ের পরও পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সের তদন্ত সিআইডির কাছে হস্তান্তরের কারণ জানতে চাইলে জহুরুল হক বলেন, ‘আইন তো পার্লামেন্টে পাস করা আছে, সেটা তো আমরা না করছি না। আইন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে দুদক কোনটা তদন্ত করবে, কোনটা করবে না, সেই সিদ্ধান্ত কমিশন নেবে। এখন আইনও আছে, আমাদের ওপর নির্দেশনাও আছে। হাইকোর্টের রায় অনুসারে সংবিধানের ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের রায় আমরা মানতে বাধ্য।’

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম বলেন, মানি লন্ডারিং আইনে ২৭টি অপরাধের মধ্যে কেবল ‘দুর্নীতি ও ঘুষ’ নিয়ে কাজ করতে পারত দুদক। কিন্তু আইনটা সংশোধনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আবেদন করেছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী দুদক মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত যেকোনো অপরাধ তদন্ত করতে পারবে। এতে আইনে কোনো বাধা নেই।

উচ্চ আদালতে দুদকের ক্ষমতা বাড়িয়ে রায় হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে, কিন্তু ছয় বছর ঝুঁলে থাকা পানামা ও প্যারাইডাইস কেলেঙ্কারির বিষয়টি দুদকের ‘তফসিলভুক্ত নয়’ কারণ দেখিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে হস্তান্তর করা হলো কেন- এমন প্রশ্নে খুরশীদ আলম বলেন, ‘দুদক দিয়ে দিয়েছে। তারা যদি মনে করে আবার চলে আসবে। দিয়ে দিয়েছে মানে এটা না সিআইডির হাতে ক্ষমতা। আমি মনে করি সিআইডির হাতে আর এসব ক্ষমতা রাখা উচিত না, সব দুদকে দেওয়া উচিত।’

চলতি বছরে ১৭ ফেব্রুয়ারি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে অধিকতর ভূমিকা পালনের জন্য প্রচলিত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও বিধিমালার তফসিলে বর্ণিত আরও সাতটি অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা চেয়ে দুদক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেয়।

ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানির আড়ালে এবং হুন্ডি ও অন্যান্য অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ এবং অর্থ পুনরুদ্ধারে দুদক ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হওয়ায় বাংলাদেশের বাইরে মুদ্রা পাচারের অপরাধের তদন্ত করতে পারে না সংস্থাটি।’

দুদক সচিব মাহবুব হোসেনের স্বাক্ষরে পাঠানো চিঠিতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ২(ঠ) ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা ২০১৯-এর তফসিলে বর্ণিত ২৭ অপরাধের মধ্যে ৭টি অপরাধের এখতিয়ার কর্তৃপক্ষের বিষয়ে সংশোধনের তাগিদ দেওয়া হয়। ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’র অনুসন্ধান ও তদন্ত ছাড়া যে সাতটি অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার চাইছে দুদক, সেগুলো হলো দস্তাবেজ জালকরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার, চোরাচালানি ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ, করসংক্রান্ত অপরাধ ও পুঁজিবাজার সংক্রান্ত অপরাধ।

মানিলন্ডারিং আইনে ২৭ অপরাধ
দুর্নীতি ও ঘুষ, মুদ্রা জালকরণ, দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, অবৈধ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা, অপহরণ, অবৈধভাবে আটকে রাখা ও পণবন্দি করা, খুন, মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি, নারী ও শিশু পাচার, চোরাকারবার, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, চুরি বা ডাকাতি বা দস্যুতা বা জলদস্যুতা বা বিমান দস্যুতা, মানব পাচার বা কোনো ব্যক্তিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ বা মূল্যবান দ্রব্য গ্রহণ করা বা করিবার চেষ্টা, যৌতুক, চোরাচালানি ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ, কর সংক্রান্ত অপরাধ, মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থ জোগান, ভেজাল বা স্বত্ব লঙ্ঘন করে পণ্য উৎপাদন, পরিবেশগত অপরাধ, যৌন নিপীড়ন, পুঁজিবাজার সম্পর্কিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়ার আগে তা কাজে লাগিয়ে শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে বাজার সুবিধা গ্রহণ ও ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার লক্ষ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা, সংঘবদ্ধ অপরাধ বা সংঘবদ্ধ অপরাধী দলে অংশগ্রহণ ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়।

অর্থ পাচার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার বা ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। জিএফআই-এর ওই প্রতিবেদন আরও বলা হয়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। পাচার হওয়া এসব অর্থের বিষয়ে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছেও কোনো তথ্য নেই।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন
মানিলন্ডারিং তথা অর্থ পাচার, স্থানান্তর, রূপান্তরকে ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে প্রথম ২০০২ সালে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইনে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি মানিলন্ডারিং অপরাধ তদন্ত করতে পারতেন। পরবর্তীকালে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০২ বাতিল করে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০০৮ জারি করা হয়। অধ্যাদেশের অধীন অপরাধগুলো দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ মর্মে গণ্য করা। ওই অধ্যাদেশের অধীন ১৭টি সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে উদ্ভূত সব মানিলন্ডারিং কেবল দুদক তদন্ত করতে পারবে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০০৮ বাতিল হয়ে পরে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০০৯ জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই আইনের অধীন অপরাধগুলো দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ গণ্য করে দুর্নীতি দমন কমিশন বা কমিশন থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা কর্তৃক তদন্তযোগ্য ঘোষণা করা হয়। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০০৯ বাতিল করে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০১২ জারি করা হয়, যা পরবর্তীতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস হয়। ২০১২ সালের সংশোধিত আইনে ১৭টি সম্পৃক্ত অপরাধের পরিবর্তে ২৭টি সম্পৃক্ত অপরাধ প্রতিস্থাপন করা হয়। শুরুতে মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান ও তদন্তের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ছিল দুদক।

২০১৫ সালে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ সংশোধন হওয়ার পরে জারিকৃত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯-এর তফশিলে ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’ ছাড়া অন্য ২৬টি সম্পৃক্ত অপরাধসংশ্লিষ্ট মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ওপর।

শেয়ার করুন